দুর্যোগের মধ্যেই অচল দেশের পাঁচ ডপলার রাডার
দেশজুড়ে টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যা পরিস্থিতির মধ্যে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের পাঁচটি ডপলার রাডারের সবকটিই বর্তমানে অকার্যকর থাকায় তাৎক্ষণিক ও নির্ভুল আবহাওয়া তথ্য সংগ্রহে সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আবহাওয়া অধিদফতর বলছে, পূর্বাভাস তৈরিতে ডপলার রাডার প্রধান উপাদান নয়; এটি সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে আবহাওয়া ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। তাদের মতে, আধুনিক পূর্বাভাস ব্যবস্থায় বজ্রঝড়, অতিবৃষ্টি, কালবৈশাখী কিংবা টর্নেডোর গতিপ্রকৃতি নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে ডপলার রাডারের বিকল্প নেই। রাডারগুলো দীর্ঘদিন অচল থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকের অভিযোগ, পূর্বাভাসে বৃষ্টির সম্ভাবনা দেখানো হলেও বাস্তবে বৃষ্টি হচ্ছে না, আবার কোনো সতর্কতা ছাড়াই হঠাৎ ভারী বর্ষণ বা ঝড় দেখা দিচ্ছে। এতে আবহাওয়া পূর্বাভাসের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, উপগ্রহের মাধ্যমে মেঘের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেলেও কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় কত সময়ের মধ্যে, কী মাত্রায় ঝড় বা ভারী বৃষ্টি আঘাত হানতে পারে-সেই তথ্য নির্ভুলভাবে দিতে পারে কেবল ডপলার রাডার। ফলে রাডার অচল থাকায় তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা প্রদানে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছে নদীপথের যাত্রী ও নৌপরিবহন সংশ্লিষ্টরা। তাদের আশঙ্কা, মাঝনদীতে আকস্মিক বৈরী আবহাওয়ার সৃষ্টি হলে সময়মতো সতর্কবার্তা না পাওয়ায় বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। লঞ্চচালক ও মালিকদেরও অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত সময় মিলছে না।
নৌপরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নদীনির্ভর বাংলাদেশের নিরাপদ নৌযাত্রা নিশ্চিত করতে কার্যকর রাডার ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্ভুল আবহাওয়া তথ্য ছাড়া ঝুঁকিমুক্ত নৌ চলাচল নিশ্চিত করা কঠিন। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্যের ভিত্তিতেই বিভিন্ন নৌযানে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। পূর্বাভাসে ত্রুটি থাকলে যাত্রী ও নৌযানের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
জানা গেছে, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত আধুনিক ডপলার রাডারগুলো বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে অচল হয়ে রয়েছে। কোথাও সফটওয়্যার ত্রুটি, কোথাও বিদ্যুৎ সরবরাহের ওঠানামা, আবার কোথাও যন্ত্রাংশের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় রাডারগুলো বন্ধ রয়েছে। আবহাওয়া অধিদফতরের উপ-পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) নুরুল করিম জানান, রাডার পূর্বাভাসের একমাত্র উপকরণ নয়; এটি একটি সহায়ক ব্যবস্থা। তিনটি রাডারের নির্ধারিত কার্যকাল শেষ হওয়ায় সেগুলো নবায়নের কাজ চলছে। রংপুরের রাডার শিগগিরই চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া গাজীপুরের রাডার সাম্প্রতিক ঝড়ে বৈদ্যুতিক ত্রুটি ও ট্রান্সফরমার বিকলের কারণে বন্ধ রয়েছে, যা দ্রুত মেরামতের চেষ্টা চলছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, রাডার শুধু আবহাওয়া পর্যবেক্ষণেই নয়, বিমান চলাচল ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাতেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি। এটি বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে উড়োজাহাজের অবস্থান, গতি ও দিক নির্ণয়ের পাশাপাশি ঝড়-বৃষ্টি ও বজ্রপাতের অবস্থান শনাক্ত করে নিরাপদ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে।
কানাডার সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস সম্ভাবনার ভিত্তিতে তৈরি হলেও ডপলার রাডার প্রতি কয়েক মিনিট পরপর নতুন তথ্য সরবরাহ করে। বিশেষ করে কালবৈশাখী, বজ্রঝড়, শিলাবৃষ্টি ও প্রবল বৃষ্টিপাতের মতো ঘটনায় নির্ভুল তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে রাডারের বিকল্প নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্যোগপ্রবণ দেশের জন্য কার্যকর রাডার ব্যবস্থা কেবল প্রযুক্তিগত সুবিধা নয়, বরং জননিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। তাই দ্রুত অচল রাডারগুলো সচল করে নির্ভুল পূর্বাভাস নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হচ্ছে।