২৫ কোটি গাছের পরিকল্পনার আগে প্রয়োজন নির্বিচারে বৃক্ষনিধন বন্ধ করা
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও উবিনীগের নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতার বলেছেন, দেশে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণের উদ্যোগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে এর আগে বিদ্যমান গাছ কাটা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তার মতে, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন অব্যাহত রেখে শুধু নতুন গাছ লাগিয়ে পরিবেশ ও জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না।
সম্প্রতি এক নিবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, সরকার আগামী পাঁচ বছরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণের যে পরিকল্পনা নিয়েছে, তা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত ‘ন্যাশনাল গ্রিন মিশন’-এর অংশ। তবে এ কর্মসূচির কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়া গাছ কাটার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
ফরিদা আখতার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তারের মতো নানা সংকটের মধ্যে পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষরোপণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু একই সময়ে যদি পুরোনো ও পূর্ণবয়স্ক গাছ কাটা চলতে থাকে, তাহলে নতুন করে ২৫ কোটি কিংবা ৫০ কোটি গাছ লাগিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বহু বছর ধরে বেড়ে ওঠা পূর্ণবয়স্ক গাছ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব গাছ বিপুল পরিমাণ অক্সিজেন সরবরাহের পাশাপাশি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে পরিবেশকে বাসযোগ্য রাখতে সহায়তা করে। ফলে নতুন গাছ লাগানোর পাশাপাশি বিদ্যমান গাছ সংরক্ষণকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
উবিনীগের নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে কাঠের ব্যবহার আইনত নিষিদ্ধ হলেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখনো তা অব্যাহত রয়েছে। একইভাবে তামাক চাষে তামাক পাতা শুকানোর জন্য বিপুল পরিমাণ কাঠ ব্যবহারের কারণে বন উজাড়ের প্রবণতা বাড়ছে। উবিনীগের গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, একটি তন্দুর বা ভাটির জন্য এক মৌসুমে প্রায় ২৪০ মণ জ্বালানি কাঠ প্রয়োজন হয়, যার জন্য এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০টি মাঝারি আকারের গাছ কাটতে হয়। বান্দরবান, কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে তামাক চাষের কারণে দীর্ঘদিন ধরে গাছ নিধনের ঘটনা ঘটছে।
তিনি আরও বলেন, মহাসড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রেও বিপুলসংখ্যক গাছ কাটা হয়। তবে কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্পে গাছ না কাটার নির্দেশ এবং তিন হাজারের বেশি গাছ রক্ষার উদ্যোগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। ফরিদা আখতারের মতে, সব ধরনের গাছ পরিবেশের জন্য সমান উপকারী নয়। ইউক্যালিপটাস, আকাশমণি ও মেহগনির মতো কিছু প্রজাতি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এসব গাছের ব্যবস্থাপনা নিয়েও পরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন।
তিনি কেনিয়ার নোবেলজয়ী পরিবেশকর্মী ওয়াঙ্গারি মাথাইয়ের ‘গ্রিন বেল্ট মুভমেন্ট’-এর উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, বন উজাড় রোধ ও বৃক্ষরোপণকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমেই পরিবেশ সংরক্ষণে স্থায়ী ফল অর্জন সম্ভব। ফরিদা আখতার মনে করেন, দেশের ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় হলেও এর সফলতা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই বিদ্যমান গাছ সংরক্ষণ এবং নির্বিচারে বৃক্ষনিধন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।