৫০১ রয়েল রিসোর্টকাণ্ড নিয়ে মুখ খুললেন মামুনুল হক
নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত রয়েল রিসোর্টকাণ্ড নিয়ে ঘটনার পাঁচ বছর পর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। তিনি দাবি করেছেন, ২০২১ সালের ৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের রয়েল রিসোর্টে তার সঙ্গে থাকা জান্নাত আরা ঝর্ণা তার বৈধ স্ত্রী ছিলেন এবং তৎকালীন সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছিলেন।
শনিবার (২০ জুন) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি এ বিষয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন।
পোস্টে মামুনুল হক উল্লেখ করেন, ২০২১ সালের ৩ এপ্রিল তিনি জান্নাত আরা ঝর্ণাকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের রয়েল রিসোর্টের ৫০১ নম্বর কক্ষে অবস্থান করছিলেন। এ সময় পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, কয়েকজন সাংবাদিক ও বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা সেখানে উপস্থিত হন বলে দাবি করেন তিনি। রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ফোন পেয়ে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর কক্ষের দরজা খুলতেই একদল লোক সেখানে প্রবেশ করে এবং ঘটনাটি বিভিন্ন মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আচরণ প্রসঙ্গে মামুনুল হক অভিযোগ করেন, তাকে ও তার স্ত্রীকে বিভিন্নভাবে হেনস্তা করা হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি ঝর্ণাকে ওয়াশরুমে আশ্রয় নিতে বলেন। পরে নারী পুলিশ সদস্যরা সেখানে প্রবেশ করে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তিনি দাবি করেন, ওই সময় তারা দুজনই নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন এবং বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রচারিত হয়।
পোস্টে তিনি আরও দাবি করেন, শুরুতে তার মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়া হলেও পরবর্তীতে একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের হস্তক্ষেপে সেটি ফেরত দেওয়া হয় এবং পরিচিতজনদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি যাচাইয়ের চেষ্টা করা হয়। তবে এর মধ্যেই গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত হয়ে তাদের থানায় নেওয়ার নির্দেশ দেন বলে দাবি করেন তিনি।
মামুনুল হকের ভাষ্য অনুযায়ী, রিসোর্ট থেকে বের হওয়ার পর বিপুলসংখ্যক মানুষ সেখানে জড়ো হয়েছিল এবং উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তিনি দাবি করেন, সে সময় তিনি উপস্থিত জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করেন এবং পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখেন।
জান্নাত আরা ঝর্ণার সঙ্গে নিজের সম্পর্কের বিষয়ে মামুনুল হক বলেন, ঝর্ণা এর আগে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হাফেজ শহিদুল ইসলামের স্ত্রী ছিলেন। পারিবারিক কারণে তাদের বিচ্ছেদ হওয়ার পর ঝর্ণার সঙ্গে তার যোগাযোগ শুরু হয়। পরে ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী তাদের মধ্যে বিবাহ সম্পন্ন হয় বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি জানান, বিবাহের পর জান্নাত আরা ঝর্ণাকে কোরআন শিক্ষাসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয় এবং তিনি পৃথকভাবে বসবাস করতেন। প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি তার সঙ্গে দেখা করতেন।
একাধিক বিয়ে গোপন রাখার বিষয়ে মামুনুল হক বলেন, উপমহাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রেই দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি শুরুতে পরিবার থেকে গোপন রাখা হয়। পারিবারিক অস্থিরতা এড়ানোর জন্য তিনি বিষয়টি প্রকাশ করেননি বলে উল্লেখ করেন। তবে ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তি এ বিষয়ে অবগত ছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
রয়েল রিসোর্টে নিবন্ধনের সময় ভিন্ন নাম ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্রে তার প্রথম স্ত্রীর নাম থাকায় এবং জান্নাত আরার পরিচয়পত্রে আগের স্বামীর নাম সংশোধন না হওয়ায় পারস্পরিক সিদ্ধান্তে তারা প্রথম স্ত্রীর নাম ব্যবহার করেছিলেন। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপে জান্নাত আরাকে অন্য পরিচয়ে উল্লেখ করার প্রসঙ্গে মামুনুল হক বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় তিনি বিষয়টি ধীরে ধীরে জানাতে চেয়েছিলেন। সে কারণে তিনি জান্নাত আরার পূর্ববর্তী পরিচয় ব্যবহার করেছিলেন।
পোস্টে তিনি আরও দাবি করেন, ঘটনার পর তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তার সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা তিনি গ্রহণ করেননি। মুতা বিয়ে বা সাময়িক বিয়ে নিয়ে প্রচলিত বিভিন্ন আলোচনাকেও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন মামুনুল হক। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের বিবাহ ছিল শরিয়তসম্মত এবং এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে যে তথ্য প্রচার করা হয়েছে, তার অনেক কিছুই বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
জান্নাত আরা ঝর্ণার সঙ্গে বর্তমান সম্পর্কের বিষয়ে তিনি জানান, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক বজায় ছিল। তবে পরবর্তীতে পারস্পরিক মতপার্থক্যের কারণে আলোচনার মাধ্যমে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিচ্ছেদের আগ পর্যন্ত তার ভরণপোষণ ও অন্যান্য অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
পোস্টের শেষাংশে মামুনুল হক অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিরোধের কারণে তাকে লক্ষ্য করে নানা ধরনের অপপ্রচার চালানো হয়েছে। তবে এসব ঘটনার পরও তিনি নিজের অবস্থানে অনড় রয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন।