ভারত-চীন সম্পর্ক জোরদারে স্থগিত কৌশলগত সংলাপ দ্রুত চালুর আহ্বান বেইজিংয়ের
ভারত ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা বিভিন্ন কৌশলগত সংলাপ দ্রুত পুনরায় চালুর আহ্বান জানিয়েছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও দেশটির কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য ওয়াং ই। তিনি বলেছেন, বাণিজ্য, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা সহযোগিতা, গণমাধ্যম এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয় আরও সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন।সোমবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের সঙ্গে বৈঠকে এসব মন্তব্য করেন ওয়াং ই। পরে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বৈঠকের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে।
বৈঠকে ওয়াং ই বলেন, পারস্পরিক সম্মান ও আস্থার ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে সংবেদনশীল বিষয়গুলো সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলা করা জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, সীমান্তসংক্রান্ত মতপার্থক্য যেন সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত না করে, সে বিষয়ে উভয় পক্ষকে সচেতন থাকতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে স্থবির থাকা কৌশলগত সংলাপ পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে চীনের এই আগ্রহ দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টায় নতুন বার্তা বহন করছে। এর আগে চলতি মাসে ভারতে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত জু ফেইহংও দুই দেশের প্রায় ৫০টি সরকারি পর্যায়ের কৌশলগত আলোচনার অধিকাংশ এখনো বন্ধ থাকার বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন।
ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের বৈঠকের ফাঁকে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের সাম্প্রতিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। ভারতের পক্ষ থেকে প্রকাশিত সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে জানানো হয়, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতার দিকে এগোচ্ছে। তবে সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় চালুসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো অগ্রগতি সীমিত।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের পরবর্তী বৈঠকে অংশ নিতে অজিত ডোভালের সম্ভাব্য বেইজিং সফরের প্রস্তুতি চলছে। এই সফরকে ভারত-চীন সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের ভারত সফরের সম্ভাবনা নিয়েও কূটনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে ওয়াং ই বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দুই দেশ হিসেবে চীন ও ভারতের সহযোগিতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বলেন, দুই দেশকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং অংশীদার হিসেবে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সীমান্ত এলাকায় তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ বজায় রয়েছে। এই অগ্রগতিকে টেকসই করতে উভয় পক্ষের আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি।
বৈঠকে ওয়াং ই বাণিজ্য, অর্থনীতি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহযোগিতা এবং গণমাধ্যম খাতে স্থগিত আলোচনা দ্রুত পুনরায় চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন। অন্যদিকে, অজিত ডোভাল বলেন, ভারত ও চীনকে প্রতিযোগী নয়, সহযোগী অংশীদার হিসেবে এগিয়ে যেতে হবে। তিনি জানান, স্থিতিশীল ও গঠনমূলক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উভয় দেশের স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মতপার্থক্য থাকলেও তা শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধান করা উচিত বলেও তিনি মত দেন।
ডোভাল আরও জানান, দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছে, ভারত তা বাস্তবায়নে আগ্রহী। পাশাপাশি তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, তাইওয়ান প্রশ্নে ভারতের নীতিগত অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি। পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই বৈঠক ভারত-চীন সম্পর্ক উন্নয়নের প্রক্রিয়ায় নতুন গতি আনতে পারে। তবে সীমান্ত বিরোধসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর পূর্ণ সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার গতি কতটা বাড়বে, তা সময়ই নির্ধারণ করবে।