ক্ষুদ্র দেশ, বিশাল স্বপ্ন: ইতিহাস গড়ে বিশ্বকাপের নকআউটে কেপ ভার্দে
বিশ্বকাপ ফুটবলে রূপকথার মতো যাত্রা অব্যাহত রেখেছে আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। মাত্র পাঁচ লাখের কিছু বেশি জনসংখ্যার দেশটি প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নিয়েই জায়গা করে নিয়েছে নকআউট পর্বে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে নকআউট পর্বে ওঠা সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে নতুন ইতিহাস গড়েছে তারা। শুক্রবার রাতে সৌদি আরবের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে গ্রুপ পর্ব শেষ করে কেপ ভার্দে। টানা তিনটি ম্যাচে ড্র করলেও গ্রুপের দ্বিতীয় দল হিসেবে শেষ ৩২-এ জায়গা নিশ্চিত করে তারা।
ম্যাচ শেষে কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহা (Vozinha) বলেন, “আমরা ছোট একটি দেশ। কিন্তু আমাদের হৃদয় অনেক বড়। আমরা লড়াই করতে জানি।”
বিশ্বকাপের অভিষেক আসরে কেপ ভার্দে শুরুতেই ২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দেয়। দ্বিতীয় ম্যাচে পিছিয়ে পড়েও উরুগুয়ের বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র করে চমক দেখায় দলটি। শেষ ম্যাচে সৌদি আরবের বিপক্ষে এক পয়েন্ট অর্জন করে মোট তিন পয়েন্ট নিয়ে নকআউট নিশ্চিত করে।
অন্যদিকে একই গ্রুপে উরুগুয়েকে হারিয়ে পূর্ণ নয় পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন। কেপ ভার্দের প্রধান কোচ বুবিস্তা বলেন, “বিশ্বকে দেখানোর জন্য আমাদের খেলোয়াড়রা দারুণভাবে উদ্গ্রীব ছিল। আমরা প্রমাণ করেছি, ছোট দেশ হলেও নিজেদের স্বপ্নের জন্য লড়াই করতে জানি। এই অর্জনে আমরা গর্বিত।” আগামী ৩ জুলাই মায়ামিতে অনুষ্ঠিত শেষ ৩২-এর ম্যাচে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে কেপ ভার্দে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে তিনটি ম্যাচই ড্র করে নকআউটে ওঠার ঘটনা খুবই বিরল। এর আগে ১৯৫৮ সালে ওয়েলস, ১৯৯০ সালে আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডস এবং ১৯৯৮ সালে চিলি এই কৃতিত্ব দেখিয়েছিল। তবে ২০১০ সালে নিউজিল্যান্ড তিন ম্যাচে ড্র করেও নকআউটে উঠতে পারেনি। ম্যাচের আগের দিন বুবিস্তা বলেছিলেন, “স্বপ্ন দেখার অধিকার সবারই আছে, আর অসম্ভব বলে কিছু নেই।” মাঠের পারফরম্যান্সে সেই কথারই বাস্তব প্রমাণ দিয়েছে ‘ব্লু শার্কস’ খ্যাত কেপ ভার্দে।
দলের সাফল্যে সবচেয়ে বড় অবদান রাখেন গোলরক্ষক ভোজিনহা। সৌদি আরবের বিপক্ষে তিনি একাধিক দুর্দান্ত সেভ করে দলকে গোল হজমের হাত থেকে রক্ষা করেন। প্রথমার্ধের অতিরিক্ত সময়ে মোহাম্মদ কান্নোর হেড ঠেকিয়ে দেন তিনি। এরপর দ্বিতীয়ার্ধে মোহাম্মদ আবু আল-শামাত ও আবদুল্লাহ আল-হামদানের শটও অসাধারণ দক্ষতায় প্রতিহত করেন।
ভোজিনহা বলেন, “আমাদের জাতীয় দলে অনেক মানসম্পন্ন খেলোয়াড় রয়েছে। হয়তো অনেকেই মনে করেন কেপ ভার্দের খেলোয়াড়রা বড় মঞ্চে খেলার মতো নয়। কিন্তু আমরা দেখিয়ে দিতে এসেছি, বড় প্রতিযোগিতা ও বিশ্বের শীর্ষ লিগে খেলার সামর্থ্য আমাদের আছে।”
গ্যালারিতে উপস্থিত হাজারো সমর্থকের উচ্ছ্বাসে মুখর ছিল পুরো স্টেডিয়াম। ভোজিনহার মা আনা ক্যান্ডিদা এভোরাও স্ট্যান্ডে বসে ছেলের খেলা উপভোগ করেন এবং কেপ ভার্দের পতাকা উড়িয়ে দলকে উৎসাহ দেন। ম্যাচে কেপ ভার্দেও কয়েকটি ভালো সুযোগ তৈরি করেছিল। কেভিন পিনার দূরপাল্লার শট অল্পের জন্য ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে যায়। পরে লারোস দুয়ার্তের শট ঠেকিয়ে দেন সৌদি গোলরক্ষক মোহাম্মদ আল-ওয়াইস। শেষ মুহূর্তে নুনো দা কস্তার শটও লক্ষ্যে না থাকায় গোলের দেখা পায়নি দলটি।
তবে গোলশূন্য ড্রই শেষ পর্যন্ত কেপ ভার্দের জন্য যথেষ্ট ছিল। স্পেনের জয়ে উরুগুয়ে পরাজিত হওয়ার খবর নিশ্চিত হতেই আনন্দে ফেটে পড়েন কেপ ভার্দের খেলোয়াড় ও সমর্থকেরা। আবেগে অনেককে কাঁদতেও দেখা যায়। বিশ্বকাপে এমন সাফল্যের কথা আগে থেকে কল্পনা করেছিলেন কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে বুবিস্তা বলেন, “আমি সবসময় বিশ্বাস করেছি, একদিন না একদিন কেপ ভার্দে এই মঞ্চে পৌঁছাবে। এমন সাফল্য আগেভাগে অনুমান করা কঠিন, কিন্তু বিশ্বাস কখনো হারাইনি।”
অন্যদিকে গ্রুপ পর্বে মাত্র দুই পয়েন্ট নিয়ে বিদায় নেয় সৌদি আরব। দলের হতাশাজনক পারফরম্যান্স নিয়ে কোচ জর্জিওস ডোনিস বলেন, “আমরা আক্রমণ গড়ে তুলতে, ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং সুযোগ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছি। এভাবে কোনো ম্যাচ জেতা সম্ভব নয়।”