ব্যাংক খাতে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ বেড়ে প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকা
দেশের ব্যাংকিং খাতে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংক খাতের দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকায়, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে এ ধরনের ঋণ বেড়েছে ৩ লাখ ৩১ হাজার ৩৭ কোটি টাকা।
মঙ্গলবার রাতে প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন-২০২৫’-এ এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির শর্ত অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২১ সাল থেকে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পৃথক হিসাব প্রকাশ করে আসছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণ, পুনঃতপশিল করা ঋণের অনাদায়ী অংশ এবং অবলোপন করা ঋণের স্থিতি মিলিয়ে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের হিসাব নির্ধারণ করা হয়। এসব ঋণের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে আদায় অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংক খাতে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, পুনঃতপশিলের পরও অনাদায়ী রয়েছে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা এবং অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ ৮৩ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা।
এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালের শেষে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৫৬ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৪৪ দশমিক ২১ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের চাপের কারণে ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার অবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়েছে। যেখানে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর মূলধন অনুপাত সাড়ে ১২ শতাংশ ধনাত্মক থাকার কথা, সেখানে ২০২৫ সালের শেষে তা ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে। মূলত ২০টি ব্যাংকের প্রায় ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার মূলধন ঘাটতির প্রভাব পুরো খাতের ওপর পড়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে রেকর্ড ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতপশিল করা হয়েছে, যা আগের যেকোনো বছরের তুলনায় সর্বোচ্চ। তবে বিপুল পরিমাণ ঋণ পুনঃতপশিলের পরও ব্যাংকিং খাতের অধিকাংশ আর্থিক সূচকে অবনতি লক্ষ্য করা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, সামগ্রিকভাবে তারল্য পরিস্থিতিতে বড় ধরনের চাপ না থাকলেও ইসলামী ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এ খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার হার ঋণাত্মক ৪৩ দশমিক ১৮ শতাংশে নেমে এসেছে, যা দেশের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের বিশেষ সুবিধা, ঋণ পুনঃতপশিল ও পুনর্গঠনের সুযোগের কারণে বিপুল পরিমাণ অনাদায়ী ঋণ নিয়মিত হিসেবে দেখানো হয়েছিল। বর্তমানে প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পাওয়ায় ব্যাংক খাতের ঝুঁকি ও দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।