সিন্ডিকেট ও সমন্বয়হীনতায় নষ্ট হচ্ছে কোরবানির চামড়া
চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ ও বিপণনকে কেন্দ্র করে প্রতিবছরের মতো এবারও দেখা দিয়েছে বিশৃঙ্খলা। প্রত্যাশিত দাম না পেয়ে অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়া বিক্রি না করেই বাজার ছেড়ে গেছেন। ফলে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিন্ডিকেটের প্রভাব, বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং সরকারি সমন্বয়ের অভাবের কারণে দীর্ঘদিন ধরে এই সংকট কাটছে না।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে একদিনে বিপুল পরিমাণ চামড়া বাজারে এলেও এর ব্যবসা সারা বছরজুড়েই পরিচালিত হয়। কিন্তু প্রতি বছর ঈদের আগে সরকার যে মূল্য নির্ধারণ করে, তা বাস্তব বাজার পরিস্থিতি ও চামড়ার মানভেদে দামের পার্থক্য যথাযথভাবে প্রতিফলিত করে না। ফলে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বিভ্রান্ত হয়ে লোকসানের মুখে পড়েন।
চামড়া শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের চামড়া খাতের দীর্ঘস্থায়ী সংকটের অন্যতম কারণ সাভারে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সেন্ট্রাল ইটিপি) পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর না হওয়া। পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান হারাচ্ছে। এর পাশাপাশি মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় বাস্তব ব্যবসায়ীদের মতামত যথাযথভাবে প্রতিফলিত না হওয়ায় বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে।
একাধিক ব্যবসায়ীর অভিযোগ, ঈদের আগে সরকার সাধারণত লবণযুক্ত চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে সে তথ্য সঠিকভাবে পৌঁছায় না। ফলে অনেকেই মনে করেন সব ধরনের চামড়ার দাম একই হারে নির্ধারিত হয়েছে। বাস্তবে চামড়ার মান ও গ্রেড অনুযায়ী দামে বড় ধরনের পার্থক্য থাকে। চট্টগ্রামের একমাত্র ট্যানারি প্রতিষ্ঠান রীফ লেদারের পরিচালক মোখলেসুর রহমান বলেন, বাজারে চামড়ার দাম নির্ভর করে এর গুণগত মানের ওপর। উচ্চমানের চামড়া যেমন বেশি দামে বিক্রি হয়, তেমনি নিম্নমানের চামড়ার দাম তুলনামূলক অনেক কম। কিন্তু সরকারি মূল্য নির্ধারণে সাধারণত উন্নত মানের চামড়ার হিসাব বেশি গুরুত্ব পায়, যা বাস্তব বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সব সময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি জানান, নিয়মিত ব্যবসায়ীরা চামড়ার মান ও বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় ক্রয়-বিক্রয় করলেও অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী সরকারি ঘোষিত মূল্যকে একমাত্র মানদণ্ড ধরে চামড়া কিনে থাকেন। পরে ট্যানারিতে প্রত্যাশিত দামে বিক্রি করতে না পেরে লোকসানের মুখে পড়েন। চট্টগ্রাম আতুরার ডিপো কাঁচা চামড়া আড়ৎদার সমিতির সভাপতি মুসলিম উদ্দিন বলেন, বড় ব্যবসায়ীরা সাধারণত চামড়ার গ্রেডিং শেষে মূল্য নির্ধারণ করেন। তবে ছোট ব্যবসায়ীরা গড় দামে চামড়া বিক্রি করেন। ঈদের আগে ঘোষিত মূল্য অনেক সময় বাজারের গড় দামের চেয়ে বেশি হওয়ায় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত দামে চামড়া কিনে বিপাকে পড়েন। কেউ কেউ বেশি দামের আশায় চামড়া ধরে রাখেন, ফলে সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়ে চামড়া নষ্ট হওয়ার ঘটনাও ঘটে।
কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদের বলেন, কোরবানির সময় অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ চামড়া সংগ্রহ করতে হয়। এ কারণে অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ এবং বেশি দামে লবণ কিনতে হয়। একই সঙ্গে সরকারি মূল্য অনুসরণ করার চাপ থাকায় ব্যবসায়িক ঝুঁকি বেড়ে যায়। ফলে অনেক ব্যবসায়ী ইতোমধ্যে এই খাত ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি জানান, একসময় চট্টগ্রামে শতাধিক আড়ৎদার সক্রিয় থাকলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। তার মতে, শুধু মূল্য নির্ধারণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; ট্যানারিগুলো নির্ধারিত দামে চামড়া কিনছে কি না, সে বিষয়েও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, চামড়া শিল্পকে টেকসই করতে হলে শুধু দাম নির্ধারণ নয়, বরং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ, পরিবেশগত মানোন্নয়ন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সংস্কারের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় সম্ভাবনাময় এই শিল্পের সংকট আরও গভীর হতে পারে।