জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের প্রার্থী ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান। জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি ১৯১ সদস্য রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ভোটে ৯৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থী পেয়েছেন ৯১ ভোট।
তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) এক তথ্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, এই বিজয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতি জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আস্থা, গ্রহণযোগ্যতা এবং ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক প্রভাবের সুস্পষ্ট প্রতিফলন। একই সঙ্গে এটি বহুপাক্ষিক কূটনীতি, শান্তি, উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সক্রিয় ভূমিকার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বলেও উল্লেখ করা হয়।
তথ্যবিবরণীতে বলা হয়, ড. খলিলুর রহমানের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, কূটনৈতিক দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গ্রহণযোগ্যতার পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা তারেক রহমানের নেতৃত্ব, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এবং সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এই সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এতে উল্লেখ করা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সময় নির্বাচনকে সামনে রেখে হাতে মাত্র তিন মাস সময় ছিল। এই সীমিত সময়ের মধ্যেই সরকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা পরিচালনা করে। পিআইডির ভাষ্যমতে, সাধারণত বহু বছরব্যাপী প্রস্তুতি ও ধারাবাহিক যোগাযোগের মাধ্যমে এ ধরনের নির্বাচনী প্রচারণা পরিচালিত হলেও বাংলাদেশ অল্প সময়ে কার্যকর প্রচেষ্টার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে সক্ষম হয়েছে।
তথ্যবিবরণীতে আরও বলা হয়, প্রধান উপদেষ্টা তারেক রহমান ১৯৭৮ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য পদে বাংলাদেশের নির্বাচনের বিষয়টি স্মরণ করেন। সে সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশ জাপানের মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিল।
ড. খলিলুর রহমানের প্রার্থিতা নিয়ে কূটনৈতিক কার্যক্রমের বর্ণনায় বলা হয়, বাংলাদেশ ২০২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউএনজিএ সভাপতির পদে আগ্রহ প্রকাশ করলেও ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ এবং বহুপাক্ষিক ফোরামে সক্রিয় প্রচারণা চালিয়ে সমর্থন আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
পিআইডির তথ্য অনুযায়ী, এই প্রচারণায় নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং প্রধান উপদেষ্টার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। পাশাপাশি নিউইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন এবং বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোও সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
তথ্যবিবরণীতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়, গত ১৩ মে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত একটি ইন্টারঅ্যাকটিভ ডায়ালগে ড. খলিলুর রহমান তার ভিশন ও অগ্রাধিকারসমূহ উপস্থাপন করেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বর্তমান সভাপতি আনালেনা বেয়ারবকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সংলাপে অংশ নিয়ে তিনি বহুপাক্ষিকতা, জাতিসংঘ সংস্কার, উন্নয়নশীল দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং টেকসই উন্নয়ন নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন।
তথ্য অধিদপ্তরের ভাষ্যমতে, ওই সংলাপের পর বাংলাদেশ প্রায় ৩০টি দেশের প্রকাশ্য সমর্থন লাভ করে, যা নির্বাচনে বিজয়ের পথকে আরও সুগম করে।
তথ্যবিবরণীতে আরও বলা হয়, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যখন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে, তখন বাংলাদেশ সংলাপ, সহযোগিতা ও ঐকমত্যভিত্তিক কূটনীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। এই নীতিগত অবস্থান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও ইতিবাচকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশ সরকারের মতে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচন শুধু একটি কূটনৈতিক অর্জন নয়; এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা, নেতৃত্ব এবং গ্রহণযোগ্যতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।