ঈদুল আজহা সামনে এলেই গ্রামগঞ্জের অনেক মানুষের মনে একটি সাধারণ প্রশ্ন দেখা দেয়-“আমার ওপর কি কোরবানি ওয়াজিব?” অনেকেই মনে করেন, কোরবানি শুধু বড়লোকদের জন্য। আবার কেউ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সঠিক মাসয়ালা না জানার কারণে কোরবানি থেকে দূরে থাকেন। অথচ ইসলামে কোরবানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,
“আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানির বিধান নির্ধারণ করেছি, যাতে তারা আল্লাহর দেওয়া চতুষ্পদ জন্তুর ওপর তাঁর নাম উচ্চারণ করে।”
-পবিত্র কোরআন, সুরা হজ, আয়াত: ৩৪
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“কোরবানির দিনের আমলসমূহের মধ্যে আল্লাহর কাছে পশু কোরবানির চেয়ে অধিক প্রিয় আর কিছু নেই।”
-সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৪৯৩
অন্য এক হাদিসে তিনি বলেন,
“কোরবানি হলো তোমাদের পিতা ইব্রাহিম (আ.)-এর সুন্নত।” সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩১২৭
কোরবানি কখন করতে হয়-
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, ১০ জিলহজ ঈদের নামাজের পর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোরবানি করা যায়। এই নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু জবাই করতে হয়।
কার ওপর কোরবানি ওয়াজিব-
ফিকহে হানাফি অনুযায়ী নিচের শর্তগুলো পূরণ হলে একজন মুসলমানের ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়-
মুসলমান হতে হবে, প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে, সুস্থ মস্তিষ্কের হতে হবে, সফরে বা দীর্ঘ ভ্রমণে না থাকতে হবে
নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হতে হবে
তবে ছোট শিশু, মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি এবং শরিয়তসম্মত মুসাফিরের ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি না করার বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন,
“যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।”
-মুস্তাদরাকে হাকিম, হাদিস: ৩৫১৯
নেসাব কী, সহজভাবে বুঝুন-
অনেকেই মনে করেন, ব্যাংকে লাখ লাখ টাকা না থাকলে কোরবানি দিতে হয় না। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। নিজের ও পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ, বসবাসের ঘর, প্রয়োজনীয় কাপড়চোপড় ও ব্যবহার্য জিনিস বাদ দেওয়ার পর যদি অতিরিক্ত সম্পদ থাকে, তাহলে সেটার হিসাব করতে হবে।
যেমন-
ঘরে জমা নগদ টাকা, ব্যাংকের সঞ্চয়,ব্যবসার মালামাল, বিক্রির জন্য রাখা জমি,অতিরিক্ত স্বর্ণ বা রুপা এসব মিলিয়ে যদি সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপার সমমূল্যের সম্পদ হয়, তাহলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে। তবে বসবাসের একমাত্র ঘর, ব্যবহার করা আসবাবপত্র, কৃষিকাজের প্রয়োজনীয় জিনিস বা সংসার চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ নেসাবের মধ্যে ধরা হয় না।
কোরবানির মূল শিক্ষা
ইসলামে কোরবানি শুধু পশু জবাই নয়; এটি ত্যাগ, তাকওয়া, সহমর্মিতা ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের শিক্ষা। কোরবানির মাধ্যমে সমাজের গরিব ও অসহায় মানুষের কাছেও ঈদের আনন্দ পৌঁছে যায়।
ইসলামি বিশ্লেষকদের মতে, সামর্থ্যবান মুসলমানদের উচিত কোরআন-হাদিসের নির্দেশনা জেনে আন্তরিকতার সঙ্গে কোরবানি আদায় করা।