রাজধানীতে বিরোধপূর্ণ জমি দখলকে কেন্দ্র করে একের পর এক হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। এসব ঘটনার নেপথ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাদের বিরুদ্ধে ২০০২ সালের ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর আদলে বড় ধরনের অভিযান চালানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সম্প্রতি ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রোপার্টিজ, মিরপুরের রাড্ডা ক্লিনিক, মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান ও আদাবরের শ্যামলী হাউজিং এলাকায় হামলা ও জমি দখলসংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনা সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষ, জমির মালিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগীদের আশঙ্কা, বিরোধপূর্ণ জমির দাবি তুলে যেকোনো সময় অস্ত্রধারীরা হামলা চালিয়ে দখলের চেষ্টা করতে পারে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা সক্রিয় হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনা পর্যালোচনা করে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে সরকার। এ ক্ষেত্রে ২০০২ সালের ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর আদলে বড় অভিযান চালানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক হামলা ও সহিংসতার পেছনে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মদদ এবং বিভিন্ন পক্ষের অভ্যন্তরীণ বিরোধের তথ্য গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এসব ঘটনার মাধ্যমে জনজীবনে অস্থিরতা সৃষ্টি করে সরকারকে চাপে ফেলার চেষ্টা হতে পারে বলেও প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। সূত্রটির মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যৌথ অভিযান চালানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরও জানিয়েছে, দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও নেপথ্যের ইন্ধনদাতাদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। তদন্তে যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাচ্ছে, তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। অপরাধীদের ধরতে পোশাকধারী পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশ যৌথভাবে অভিযান চালাচ্ছে। এসব অভিযান আরও জোরদার করা হবে। নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠা অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজও চলছে বলে জানান তিনি। সাবেক আইজিপি নূরুল হুদা বলেন, অপরাধমূলক ঘটনাগুলো কারা ঘটাচ্ছে এবং কী কারণে ঘটাচ্ছে, তা খুঁজে বের করা জরুরি। প্রতিটি ঘটনার পেছনে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে সরকারকে চাপে ফেলার চেষ্টা হতে পারে এ বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
নিউ গিনি প্রোপার্টিজে হামলার নেপথ্যে জমি নিয়ে বিরোধ
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রোপার্টিজে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের পেছনে দীর্ঘদিনের জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। এ বিরোধে সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও প্রতিষ্ঠানটির মালিক নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়ার নাম এসেছে। সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়া আগে জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আওয়ামী রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি আবার জামায়াতের রাজনীতিতে যুক্ত হন বলে দাবি করা হয়েছে। বিরোধপূর্ণ জমিটি তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল। ওই জমিতে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের একটি স্টুডিও ছিল। প্রায় দেড় বছর আগে তাঁকে সেখানে একটি কক্ষ ভাড়া দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়া। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, জমিটির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে শাহাদাতের লোকজন সেখানে হামলা চালায় বলে অভিযোগ উঠেছে। হামলায় নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর সহযোগী সোহেলের বিরুদ্ধে। হামলার পর ঘটনাটিকে বিএনপি বা যুবদলের চাঁদাবাজি হিসেবে প্রচারের চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, হামলার আগে শাহাদাতের শুটার পরিচয় দিয়ে সোহেল তাঁকে মোবাইল ফোনে হুমকি দিয়েছিলেন। জমিতে সালমান মুক্তাদিরকে কক্ষ ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি নিয়েই দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয় বলে জানান তিনি।
রাড্ডা ক্লিনিকের জমি দখলের অভিযোগ
মিরপুরের রাড্ডা ক্লিনিকের জমি দখল নিয়েও নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ১৯৭৪ সাল থেকে পরিচালিত এই দাতব্য প্রতিষ্ঠানের জমি নিয়ে একটি পক্ষের দখলচেষ্টার পরিকল্পনা ছিল।গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে, অর্থাৎ ২৫ সেপ্টেম্বরের প্রথম প্রহরে, সেখানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, জমিটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে ভবন ভেঙে তছনছ করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, স্থানীয় সন্ত্রাসী ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট কয়েকটি পক্ষ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে সম্পত্তিটি দখলের চেষ্টা করেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
চাঁদ উদ্যান ও শ্যামলী হাউজিংয়ে নিরাপত্তাহীনতা
মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান ও আদাবরের শ্যামলী হাউজিং এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই জমি দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এসব এলাকার বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প, সরকারি খাসজমি এবং প্রবাসীদের মালিকানাধীন বিরোধপূর্ণ জমি দখল নিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম আলোচনায় এসেছে।অভিযোগ রয়েছে, কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসী ক্যাডারদের ব্যবহার করে রাজনৈতিক দলের পরিচয় সামনে রেখে চাঁদাবাজি ও জমি দখলের চেষ্টা চলছে। এতে জমির মালিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন বলেন, সাম্প্রতিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা নজরদারি, টহল ও চেকপোস্ট জোরদার করা হয়েছে। অপরাধপ্রবণ এলাকা ও অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।