মৃত্যুর মিছিল যেন ক্রমেই লম্বা হচ্ছে মনসিংহের সড়ক-মহাসড়কে। অতিরিক্ত গতি, চালকের অসতর্কতা, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকে নিয়ন্ত্রণ হারানো, প্রতিযোগিতামূলক ওভারটেকিং, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং মহাসড়কে নিষিদ্ধ থ্রি-হুইলারের অবাধ চলাচলে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। গত ২১ মাসে এসব দুর্ঘটনায় জেলায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩৭০ জন। গুরুতর আহত হয়েছেন আরও ৪১০ জন। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ময়মনসিংহের সড়ক-মহাসড়কে ৩৭৪টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই ঘটেছে ১৫০টি দুর্ঘটনা। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৫১ জন এবং গুরুতর আহত হয়েছেন ১৪২ জন। অর্থাৎ চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে গড়ে প্রায় প্রতি দুই দিনে একজনের মৃত্যু হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনায়।
বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ত্রিশাল ও ভালুকা অংশে ৭০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে ময়মনসিংহ-হালুয়াঘাট আঞ্চলিক সড়কের ফুলপুর ও তারাকান্দা উপজেলা অংশে ঘটেছে আরও ৮০টি দুর্ঘটনা।
ফুলপুর-তারাকান্দা সড়কের বিভিন্ন অংশে একাধিক ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক রয়েছে। এর মধ্যে তারাকান্দা উপজেলার কাকনি ইউনিয়নের বাগুন্দা এলাকার একটি বাঁককে বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, বাঁকগুলোতে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন। কিন্তু অনেক চালক দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানোর পাশাপাশি ঝুঁকি নিয়ে ওভারটেক করেন। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে।
ময়মনসিংহ নগরের শম্ভুগঞ্জ থেকে ফুলপুর পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার সড়ক ৩৪ ফুট প্রশস্ত। ফুলপুর থেকে হালুয়াঘাট পর্যন্ত প্রায় ১৮ কিলোমিটার সড়ক ১৮ ফুট প্রশস্ত। এই সড়ক দিয়ে হালুয়াঘাট, ফুলপুর, তারাকান্দা, ধোবাউড়া ও শেরপুরের বিভিন্ন এলাকার যানবাহন চলাচল করে।
সড়কটি তুলনামূলক ভালো হওয়ায় অনেক চালক নির্ধারিত গতিসীমার চেয়ে বেশি গতিতে গাড়ি চালান বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। বিশেষ করে সরু অংশ ও বাঁকে অতিরিক্ত গতির কারণে নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত হওয়ার পর সড়কের প্রশস্ততা বেড়েছে। তবে দুর্ঘটনা পুরোপুরি কমেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, মহাসড়কে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো, প্রতিযোগিতা করে ওভারটেকিং এবং উল্টো পথে চলাচলের কারণে বিভিন্ন অংশে দুর্ঘটনা ঘটছে।
ত্রিশালের বৈলর গ্রামের বাসিন্দা স্বপন মিয়া বলেন, বেপরোয়া গতির পাশাপাশি চালকের পাশে অতিরিক্ত যাত্রী বসানো এবং প্রতিযোগিতা করে ওভারটেকিং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। এসব অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।
জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল নিষিদ্ধ হলেও ময়মনসিংহের বিভিন্ন সড়কে এসব যানবাহন নিয়মিত চলাচল করছে। দ্রুতগতির বাস, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনের সঙ্গে ধীরগতির থ্রি-হুইলারের গতির পার্থক্য থাকায় সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ছে।
নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের ময়মনসিংহের সভাপতি আবদুল কাদির চৌধুরী বলেন, মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে তা বন্ধ হয়নি। অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত লোকাল পরিবহন না থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে এসব যানবাহন ব্যবহার করছেন। অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, বিপজ্জনক বাঁক ও ট্রাফিক আইন না মানার সঙ্গে থ্রি-হুইলারের অবাধ চলাচল যুক্ত হয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী খ. মো. শরীফুল আলম বলেন, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে গতিসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু অনেক চালক তা মানছেন না। সড়ক ভালো হওয়ায় চালকেরা অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালান। দুর্ঘটনা কমাতে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিস ময়মনসিংহের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী বলেন, বেপরোয়া গতি, মহাসড়কে কম গতির যানবাহন চলাচল, সড়কের পাশে অকেজো যানবাহন রাখা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। থ্রি-হুইলার চালকেরাও অনেক সময় ট্রাফিক নিয়ম মানেন না।
বিআরটিএর সহকারী পরিচালক আনিছুর রহমান বলেন, চালকদের অসতর্কতা ও বেপরোয়া গতির কারণে অনেক দুর্ঘটনা ঘটছে। দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল করলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। এ জন্য চালকদের সতর্কতার পাশাপাশি ট্রাফিক আইন মেনে চলা জরুরি।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। অতিরিক্ত গতি, অসতর্কতা, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, চালকের অদক্ষতা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, সড়কের ত্রুটি ও ট্রাফিক আইন অমান্যসহ বিভিন্ন কারণে দুর্ঘটনা ঘটে।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত গতি চালকের নিয়ন্ত্রণ ও জরুরি পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়ার সময় কমিয়ে দেয়। তাই প্রশিক্ষিত চালক, নির্ধারিত গতিসীমা মেনে চলা এবং ত্রুটিমুক্ত যানবাহন নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় স্পিড মনিটরিং, ট্রাফিক পুলিশের নজরদারি, পর্যাপ্ত সাইন-সিগন্যাল ও রোড মার্কিং জোরদার করা প্রয়োজন।
বিআরটিএর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২১ মাসে ৩৭৪টি দুর্ঘটনায় ৩৭০ জনের প্রাণহানি এবং ৪১০ জনের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা ময়মনসিংহের সড়ক নিরাপত্তার চিত্রকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
সড়কে দুর্ঘটনা কমাতে বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ট্রাফিক আইন প্রয়োগ, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, চালকদের প্রশিক্ষণ ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান সংস্কার এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে মহাসড়কে নিষিদ্ধ থ্রি-হুইলারের চলাচল নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমানো কঠিন হবে।
অরণ্য/ 04/10/26