দুই দশকের বেশি সময় ধরে হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে অন্যের গল্প বলেছেন তিনি। কখনো সংবাদ পাঠ করেছেন, কখনো মানুষের কথা তুলে ধরেছেন, আবার কখনো দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা পৌঁছে দিয়েছেন লাখো মানুষের কাছে। কিন্তু ৫৬ বছর বয়সে এসে সেই সাংবাদিকের নিজের জীবনই হয়ে উঠল আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের আলোচনার বিষয়।
তিনি এডওয়ার্ড রুকিডি কিজানাঙ্গোমা। উগান্ডার দীর্ঘ ঐতিহ্যের তোরো রাজ্যের নতুন রাজা। রাজসিংহাসনে বসার পর তাঁর আনুষ্ঠানিক রাজকীয় নাম হয়েছে **রাজা প্রথম এডওয়ার্ড রুকিডি নিয়াবোঙ্গো**। ২০২৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর তোরো রাজ্যের রাজধানী ফোর্ট পোর্টালের কারুজিকা প্যালেসে তাঁর অভিষেক অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদকক্ষ থেকে রাজপ্রাসাদ
রাজা হওয়ার আগে এডওয়ার্ড কিজানাঙ্গোমা ছিলেন উগান্ডার পরিচিত সাংবাদিক ও টেলিভিশন সংবাদ উপস্থাপক। তিনি উগান্ডা ব্রডকাস্টিং করপোরেশনে (UBC) সংবাদ উপস্থাপক ও সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন একজন সংবাদকর্মী হিসেবে, রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে নয়।
তবে রাজপরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল জন্মসূত্রেই। তিনি তোরোর রাজপরিবারের বাবিতো (Babiito) বংশের সদস্য। উগান্ডা সরকারের তথ্য অনুযায়ী, তিনি প্রয়াত প্রিন্স ক্রিস্টোফার পল কিজানাঙ্গোমার ছেলে এবং সাবেক রাজা স্যার জর্জ ডেভিড রুকিডি তৃতীয়ের নাতি। প্রয়াত রাজা ওয়ো নিয়িম্বা কাবাম্বা ইগুরু রুকিডি চতুর্থের সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল।
অর্থাৎ, রাজমুকুট তাঁর জন্য সম্পূর্ণ অচেনা কোনো জগৎ ছিল না। কিন্তু সাংবাদিকতা থেকে সরাসরি রাজসিংহাসনে উঠে আসার ঘটনাটি নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী।
কেন তাঁকেই বেছে নেওয়া হলো?
আগের রাজা ওয়ো রুকিডি চতুর্থ ২০২৬ সালের আগস্টে ৩৪ বছর বয়সে ক্যানসারে মারা যান। তিনি শৈশবেই তোরোর রাজা হয়েছিলেন এবং দীর্ঘ সময় রাজত্ব করেন। তাঁর মৃত্যুর পর উত্তরসূরি নির্বাচন নিয়ে রাজপরিবারে জটিলতা তৈরি হয়।
উত্তরসূরি নির্বাচনের জন্য রাজপরিবারের বাবিতো বংশের ২১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর প্রিন্স এডওয়ার্ড কিজানাঙ্গোমাকে রাজা হিসেবে মনোনীত করা হয়। ১৫ সেপ্টেম্বর তোরো কিংডমের সর্বোচ্চ পরিষদ ‘রুকুরাতো’ তাঁর মনোনয়ন অনুমোদন করে।
তবে উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক পুরোপুরি শেষ হয়নি। প্রয়াত রাজা ওয়োর মা ও বোন দাবি করেছেন, তাঁর একটি অপ্রকাশিত পুত্রসন্তান রয়েছে এবং একটি উইলে তাকে উত্তরসূরি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। অন্যদিকে রাজপরিবারের সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ওই শিশুর পরিচয় বা উত্তরাধিকার দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে নতুন রাজার অভিষেককে ঘিরে বিতর্কও তৈরি হয়েছে।
তোরো রাজ্যের ইতিহাস কত পুরোনো?
তোরো উগান্ডার ঐতিহাসিক রাজ্যগুলোর অন্যতম। এর রাজপরিবারের ইতিহাস গ্রেট লেকস অঞ্চলের বহু পুরোনো ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। উগান্ডা সরকারের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৮৩০ সালের দিকে প্রিন্স অলিমি প্রথম বুনিয়োরোর রাজপরিবার থেকে আলাদা হয়ে তোরো রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে রাজ্যটি তার স্বতন্ত্র পরিচয় ধরে রাখে। ১৮৯১ সালে ওমুকামা কাসাগামার নেতৃত্বে তোরো আবার স্বাধীন রাজ্য হিসেবে তার অবস্থান সুদৃঢ় করে।
তোরোর রাজপরিবারের মূল বংশকে বলা হয় **বাবিতো**। রাজপরিবারের পাশাপাশি বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী গোত্র ও বংশের সদস্যরা ধর্মীয়, প্রশাসনিক ও আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করে থাকেন। রাজ্যটির ঐতিহ্য শুধু রাজপ্রাসাদে সীমাবদ্ধ নয়; স্থানীয় সংস্কৃতি, ভাষা, আচার ও সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গেও এটি গভীরভাবে যুক্ত।
রাজা হলেও রাজনৈতিক শাসক নন
উগান্ডা বর্তমানে একটি সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র। দেশটির ঐতিহ্যবাহী রাজ্যগুলো আধুনিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মতো রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে না। তবে তোরোর মতো ঐতিহাসিক রাজ্যগুলো এখনো সাংস্কৃতিক পরিচয়, ঐতিহ্য ও সামাজিক সংহতির গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
নতুন রাজা এডওয়ার্ড তাঁর অভিষেকের পর ঐক্য, সংস্কৃতি সংরক্ষণ, পরিবেশ রক্ষা, শৃঙ্খলা ও পরিশ্রমের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। অভিষেক অনুষ্ঠানে উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইয়োওয়েরি মুসেভেনিও উপস্থিত ছিলেন।
### সাংবাদিক থেকে রাজা—এক ব্যতিক্রমী জীবনগল্প
এডওয়ার্ড রুকিডি কিজানাঙ্গোমার গল্প তাই শুধু একজন সাংবাদিকের রাজা হয়ে যাওয়ার গল্প নয়। এটি ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক অদ্ভুত মিলনও। একদিকে দীর্ঘদিনের সংবাদকর্মী—যিনি মানুষের গল্প বলতেন; অন্যদিকে রাজপরিবারের উত্তরাধিকারী যিনি এখন একটি ঐতিহাসিক জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব পেয়েছেন।
যে মানুষটি এতদিন ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে অন্যের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত তুলে ধরেছেন, এখন তাঁর নিজের জীবনই ইতিহাসের অংশ। মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ানো সেই সাংবাদিকের মাথায় উঠেছে রাজমুকুট আর তাঁর সামনে এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব তোরোর ঐতিহ্য ও মানুষের সঙ্গে নিজের নতুন পরিচয়ের সমন্বয় ঘটানো।