১৯৭৮ সাল থেকে এশিয়ান গেমসে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ। প্রতিটি আসর শেষ হওয়ার পরই উঠে আসে একই প্রশ্ন-কেন প্রত্যাশা অনুযায়ী সাফল্য আসে না? পরের আসরে ঘুরে দাঁড়ানোর আশ্বাসও শোনা যায়। কিন্তু চার বছর পর আবারও দেখা যায় প্রায় একই চিত্র। অংশগ্রহণ বাড়ে, প্রস্তুতির কথা হয়, প্রত্যাশাও তৈরি হয়; কিন্তু আন্তর্জাতিক পদকের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন আসে না।
জাপানের আইচি-নাগোয়া ২০তম এশিয়ান গেমসও তার ব্যতিক্রম নয়। ২২টি ডিসিপ্লিনে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত একটি ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছে। গেমস শেষে তাই আবারও সামনে এসেছে অংশগ্রহণের যৌক্তিকতা, প্রস্তুতির ঘাটতি, ফেডারেশনগুলোর পরিকল্পনা, খেলোয়াড়দের নিবেদন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সক্ষমতার প্রশ্ন।
অলিম্পিকের পর বিশ্বের অন্যতম বড় ক্রীড়া আসর এশিয়ান গেমস। এশিয়ার সেরা ক্রীড়াবিদরা এখানে অংশ নেন। অথচ বাংলাদেশের মতো সীমিত ক্রীড়া বাজেটের একটি দেশের জন্য ২২টি ডিসিপ্লিনে অংশগ্রহণ কতটা বাস্তবসম্মত গেমস শেষে সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।
বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব জোবায়েদুর রহমান রানা মনে করেন, সম্ভাবনাময় এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণে থাকা ডিসিপ্লিনগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
তার ভাষায়, ‘আমার কাছে মনে হয় সম্ভাবনাময় ও প্রশিক্ষণে রয়েছে এমন ডিসিপ্লিনগুলোকে গেমসে পাঠানো উচিত। এত সংখ্যক ডিসিপ্লিনে অংশগ্রহণ না করলেও হয়।’
এশিয়ান কিংবা কমনওয়েলথ গেমস সামনে এলেই বিভিন্ন ফেডারেশন নিজেদের কোচ, খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের পাঠানোর জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে গেমসে অংশগ্রহণকে নিজেদের খেলাধুলার প্রচার ও অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ হিসেবেও দেখা হয়। কিন্তু সীমিত সম্পদে ব্যাপক অংশগ্রহণের বদলে সম্ভাবনাময় খেলায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
রানার মতে, বিভিন্ন খেলায় এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ফলাফল এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণে থাকা খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স বিবেচনা করেই এশিয়ান গেমসের দল নির্বাচন করা উচিত।
এশিয়ান গেমসে চীনের আধিপত্য দীর্ঘদিনের। এরপর জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে লড়াই থাকে শীর্ষস্থান নিয়ে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত নিয়মিতভাবেই ভালো অবস্থানে থাকে।
বাংলাদেশের বাস্তবসম্মত লক্ষ্য সাধারণত দক্ষিণ এশিয়ার অপেক্ষাকৃত কাছাকাছি দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা। কিন্তু আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমস সেই আশাতেও ধাক্কা দিয়েছে।
শ্রীলঙ্কা অ্যাথলেটিক্সে একটি স্বর্ণ, নারী ক্রিকেটে রৌপ্য এবং পুরুষ ক্রিকেটে ব্রোঞ্জসহ মোট তিনটি পদক পেয়েছে। পাকিস্তানের পদক সংখ্যা ১০ হলেও কোনো স্বর্ণ না থাকায় তারা শ্রীলঙ্কার পেছনে অবস্থান করেছে। তুলনামূলক দুর্বল ক্রীড়া অবকাঠামোর দেশ নেপালও বাংলাদেশের চেয়ে একটি ব্রোঞ্জ বেশি পেয়েছে।
ফলে আগামী বছর মার্চে অনুষ্ঠেয় এসএ গেমস নিয়েও বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে যেখানে এশিয়ান গেমসেই পিছিয়ে পড়তে হয়েছে, সেখানে এসএ গেমসে বাংলাদেশের অবস্থান কেমন হবে—তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশার জায়গা ছিল ক্রিকেট। কিন্তু নারী ও পুরুষ—দুই দলই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। বিশেষ করে পুরুষ দলের পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক।
মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি খেলোয়াড়দের মাঠের বাইরের চলাফেরা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গেমসের মতো আন্তর্জাতিক আসরে খেলোয়াড়দের প্রস্তুতি, শৃঙ্খলা ও নিবেদন নিয়ে এমন প্রশ্ন ওঠা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্যও অস্বস্তিকর।
জোবায়েদুর রহমান রানা বলেন, ক্রিকেট একাধিকবার খেলোয়াড় পরিবর্তন করেছে এবং পদকের আশায় বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন তাদের চাহিদা অনুযায়ী সহযোগিতা করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত পদক আসেনি।
তিনি জানান, এশিয়ান গেমসে ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের সামগ্রিক বিষয় নিয়ে বিসিবিকে চিঠি দেবে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন।
বাংলাদেশের একমাত্র পদক এসেছে উশু থেকে। নারী ৫২ কেজি ওজন শ্রেণিতে জিন্নাত আক্তার ব্রোঞ্জ পেয়েছেন।
তবে এই পদকের পেছনে প্রতিযোগিতামূলক লড়াইয়ের চেয়ে ভাগ্যের ভূমিকা ছিল বেশি। প্রথম রাউন্ডে বাই পাওয়ার পর কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষ নির্ধারিত ওজনসীমার বাইরে থাকায় জিন্নাত সরাসরি সেমিফাইনালে ওঠেন। আর সেমিফাইনালে উঠেই নিশ্চিত হয় ব্রোঞ্জ।
ফলে পদক এলেও বাংলাদেশের প্রস্তুতি ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আশাবাদ তৈরি করার মতো জায়গা খুব বেশি নেই।
এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের ঐতিহ্যগতভাবে সবচেয়ে সফল ডিসিপ্লিন কাবাডি। কিন্তু সাম্প্রতিক দুই আসরে পদক না পাওয়ার পর এবার পুরুষ দলকে ঘিরে প্রত্যাশা ছিল।
কোরিয়া ও চাইনিজ তাইপেকে হারিয়ে বাংলাদেশ পদকের সম্ভাবনা তৈরি করে। এরপরই শুরু হয় উদযাপন। কিন্তু স্বাগতিক জাপানের বিপক্ষে ম্যাচটি তখনও বাকি ছিল।
জাপানকে তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে বাংলাদেশ ম্যাচটিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি—এমন অভিযোগও উঠেছে। শেষ পর্যন্ত জাপানের কাছে হেরে বাংলাদেশ কঠিন সমীকরণে পড়ে যায়। সুযোগ কাজে লাগিয়ে চাইনিজ তাইপে পদক নিশ্চিত করে।
নারী কাবাডিতেও হতাশ করেছে বাংলাদেশ। অথচ ঢাকায় নেপালকে হারানোর অভিজ্ঞতা ছিল বাংলাদেশের। কিন্তু এবার সেই নেপালই ব্রোঞ্জ জিতেছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অন্যতম সফল ডিসিপ্লিন শুটিং। কিন্তু এবার শুটারদের পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক। অনেকেই জাতীয় পর্যায়ের পারফরম্যান্সও ধরে রাখতে পারেননি।
আরচ্যারিতে বছরজুড়েই বিদেশি কোচের অধীনে প্রশিক্ষণের সুযোগ রয়েছে। তারপরও অনেক প্রতিযোগী কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই বিদায় নিয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘ প্রশিক্ষণ ও সুযোগ-সুবিধার পরও বড় আসরে কেন প্রত্যাশিত ফল আসছে না।
ব্যাডমিন্টনে অবশ্য কিছুটা ইতিবাচক দিক রয়েছে। বাংলাদেশ এবার প্রথমবারের মতো এশিয়ান গেমসে ব্যাডমিন্টনে অংশ নেয়। পুরুষ দ্বৈতে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা প্রথম অংশগ্রহণ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য কিছুটা আশার জায়গা তৈরি করেছে।
গেমসের মূল আকর্ষণ অ্যাথলেটিক্স ও সাঁতারেও বড় কোনো সাফল্য আসেনি। অ্যাথলেটিক্সে ইমরানুর রহমান সেমিফাইনালে উঠেছিলেন। সাঁতারে মুক্তি খাতুন নিজের সেরা টাইমিংও করতে পারেননি। সাইক্লিং, কারাতে ও আরও কয়েকটি ডিসিপ্লিনে অংশগ্রহণই হয়ে থেকেছে মূল অর্জন।
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের অভাব। ফুটবল, আরচ্যারি ও ক্রিকেট ছাড়া অধিকাংশ ডিসিপ্লিনে এশিয়ান গেমসের আগে এক মাসেরও কম সময় অনুশীলন হয়েছে।
এমন প্রস্তুতি নিয়ে এশিয়ার সেরা ক্রীড়াবিদদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কতটা বাস্তবসম্মত সেটিই বড় প্রশ্ন।
জোবায়েদুর রহমান রানা সরাসরি বলেছেন, ‘এক মাসের অনুশীলনে এশিয়ান গেমস থেকে পদক পাওয়া সম্ভব নয় কোনোভাবেই।’
তার মতে, সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়দের ফেডারেশনকে সারা বছর প্রশিক্ষণের মধ্যে রাখতে হবে। অনেক ফেডারেশনের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের আর্থিক সামর্থ্য নেই। সেক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
জাপান সাধারণত শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। কিন্তু আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসে আয়োজক ব্যবস্থাপনাও সমালোচনার বাইরে থাকতে পারেনি।
বিশেষ করে আবাসন সংকট ছিল বড় সমস্যা। বাংলাদেশের আরচ্যাররা এক রাত নির্ঘুম কাটানোর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। অন্য দেশের খেলোয়াড়দেরও আবাসন নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়েছে।
মিডিয়া ব্যবস্থাপনাতেও ছিল অসঙ্গতি। মিডিয়া সেন্টার থেকে বিভিন্ন ভেন্যুতে নিয়মিত শাটল সার্ভিস পাওয়ার কথা থাকলেও সাংবাদিকদের সে সুবিধা ঠিকমতো দেওয়া হয়নি। এতে সময় ও অর্থ দুটিই বেশি ব্যয় হয়েছে। পরে আয়োজক কমিটি অব্যবস্থাপনার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করে। তবে আয়োজকদের সমস্যার পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজেদের প্রস্তুতি ও পেশাদারিত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
গেমসের শুরুতেই বাংলাদেশের ব্যাডমিন্টন দল জার্সি নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে। আন্তর্জাতিক নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন জার্সি নিয়ে বাংলাদেশের অংশগ্রহণই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত শাটলার আয়মান ইবনে জামান ইউনেক্সের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় জার্সির ব্যবস্থা করেন।
প্রতিবার এশিয়ান গেমসের পর বাংলাদেশে একই ধরনের আলোচনা হয় কোথায় ভুল হলো, কেন পদক এল না, কীভাবে পরের আসরে ভালো করা যায়। তারপর সময় চলে যায়। গেমসের আগমুহূর্তে আবার প্রস্তুতি শুরু হয়, দল পাঠানো হয় এবং প্রত্যাশা তৈরি হয়।
কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে সাফল্য হঠাৎ করে আসে না। প্রয়োজন প্রতিটি ডিসিপ্লিনের সম্ভাবনা যাচাই, দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ, দক্ষ কোচ, আধুনিক সরঞ্জাম, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশগ্রহণ এবং খেলোয়াড়দের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক ও মানসিক সহায়তা।
সবচেয়ে বড় কথা, এশিয়ান গেমসে ২২টি ডিসিপ্লিনে অংশ নেওয়ার সংখ্যাগত সাফল্যের চেয়ে কয়েকটি সম্ভাবনাময় খেলায় আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়াবিদ তৈরি করাই বাংলাদেশের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
১৯৭৮ থেকে আজ পর্যন্ত এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের দীর্ঘ যাত্রা হয়েছে। কিন্তু পদকের বিচারে সেই যাত্রা এখনও অনেকটাই অন্ধকারে। আগামী দিনের লক্ষ্য যদি সত্যিই বদলাতে হয়, তাহলে শুধু গেমসের আগে প্রস্তুতি নয় গেমস শেষ হওয়ার পরের দিন থেকেই পরবর্তী গেমসের প্রস্তুতি শুরু করতে হবে।