ভিন্নমত প্রকাশের কারণে বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় নিম্ন ও উচ্চ আদালতের রায়ের পর এখন বিষয়টি আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়। ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখার পর দণ্ডিতদের আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শেরে বাংলা হলের আবাসিক ছাত্র ও তড়িৎ কৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে একটি কক্ষে নিয়ে মারধর করে হত্যা করা হয়। ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তি ও পানি আগ্রাসন নিয়ে ফেসবুকে তার দেওয়া স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।
ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিচারিক আদালতের রায়ের পর হাইকোর্টেও দণ্ড বহাল থাকায় এখন চূড়ান্ত বিচারিক প্রক্রিয়ার দিকে তাকিয়ে রয়েছে আবরারের পরিবারসহ দেশের মানুষ।
আবরার হত্যার পরদিন ৭ অক্টোবর চকবাজার থানায় ১৯ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন তার বাবা বরকত উল্লাহ। মামলার তদন্ত শেষ করতে সময় লাগে মাত্র ৩৭ দিন। একই বছরের ১৩ নভেম্বর তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক মো. ওয়াহিদুজ্জামান আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক আবু জাফর মো. কামরুজ্জামান মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন মেহেদী হাসান রাসেল, মো. অনিক সরকার ওরফে অপু, মেহেদী হাসান রবিন ওরফে শান্ত, ইফতি মোশাররফ সকাল, মো. মনিরুজ্জামান মনির, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মো. মাজেদুর রহমান মাজেদ, মো. মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ, খন্দকার তাবাকারুল ইসলাম ওরফে তানভির, হোসেন মোহাম্মদ তোহা, মো. শামীম বিল্লাহ, মো. সাদাত এ এস এম নাজমুস সাদাত, মুনতাসির আল জেমী, মো. মিজানুর রহমান মিজান, এস এম মাহমুদ সেতু, সামসুল আরেফিন রাফাত, মো. মোর্শেদ ওরফে মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম, এহতেশামুল রাব্বি ওরফে তানিম, মোহাম্মদ মোর্শেদ উজ্জামান মণ্ডল প্রকাশ জিসান এবং মুজতবা রাফিদ।
যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তরা হলেন অমিত সাহা, ইসতিয়াক আহমেদ মুন্না, মো. আকাশ হোসেন, মুহতাসিম ফুয়াদ এবং মো. মোয়াজ ওরফে মোয়াজ আবু হোরায়রা।
২০২২ সালের ৬ জানুয়ারি মামলার ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পৌঁছায়। একই সঙ্গে কারাবন্দি আসামিরা জেল আপিল করেন এবং কয়েকজন ফৌজদারি আপিলও করেন।
শুনানি শেষে ১৬ মার্চ বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি সৈয়দ এনায়েত হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ বিচারিক আদালতের দেওয়া ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখেন।
এরপর দণ্ডিত আসামিরা আপিল বিভাগে আপিল করেন। বর্তমানে সেই আপিলের শুনানি বাকি।
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, আবরার হত্যার ঘটনাটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, এটি দেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ মামলা।
তার ভাষ্য, তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপরাধ করেও পার পাওয়া যাবে—এমন একটি মানসিকতা তৈরি হয়েছিল। আবরার ভিন্নমত প্রকাশ করেছিলেন এবং সেটিই তার ওপর হামলার মূল কারণ ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এই হত্যাকাণ্ড দেশের মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। নিম্ন আদালতের পর হাইকোর্টেও দণ্ড বহাল হয়েছে। এখন সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আসামিদের আপিলের সুযোগ রয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে, আপিলগুলো একত্রে শুনানির প্রত্যাশা রয়েছে। একই সঙ্গে মামলাটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে।
অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য অনুযায়ী, আবরার হত্যার বিচার নিয়ে মানুষের আগ্রহ শুধু রায় পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। মানুষ চায় আদালতের চূড়ান্ত রায়ের কার্যকারিতা দেখতে।
তিনি মনে করেন, এত আলোচিত একটি মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া ও রায়ের বাস্তবায়ন সমাজে একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে পারে—রাজনৈতিক পরিচয় বা কোনো ধরনের ছত্রছায়া ব্যবহার করে ভিন্নমতের মানুষের ওপর নির্মম হামলা চালানোর সুযোগ নেই।
আসামিপক্ষের আইনজীবী এস এম শাহজাহান জানিয়েছেন, আপিলের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের নিয়ম অনুযায়ী দুই পক্ষকে সারসংক্ষেপ জমা দিতে হয়। এরপর পেপারবুক প্রস্তুত করা হয়। পেপারবুক প্রস্তুত হলে চেম্বার জজের মাধ্যমে মামলাটি শুনানির জন্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া রয়েছে।
অন্য আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বলেন, মামলাটি আপিল বিভাগে বিচারাধীন থাকলেও এখনো কার্যতালিকায় আসেনি। তাই শুনানির নির্দিষ্ট সময় বলা সম্ভব নয়। তবে প্রধান বিচারপতি চাইলে মামলাটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির উদ্যোগ নিতে পারেন।
এখন প্রশ্ন একটাই আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার চূড়ান্ত বিচারিক প্রক্রিয়া কবে শেষ হবে এবং আদালতের রায়ের কার্যকারিতা কবে দেখতে পাবে দেশবাসী?
সূত্র: বাংলানিউজ
#AbrarFahad #BUET #Justice