ফরিদপুরের নগরকান্দায় মন্দিরসংলগ্ন ৩৭ শতাংশ জমির মালিকানা ও ব্যবহার নিয়ে বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। আসন্ন দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে এই বিরোধ যাতে কোনো ধরনের সংঘাত বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না ঘটায়, সে জন্য দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে প্রশাসন ও পুলিশ।
বিরোধপূর্ণ জমিতে শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা সম্পন্ন করতে উভয় পক্ষকে মুচলেকা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
নগরকান্দা পৌরসভার চৌমুখা পশ্চিমপাড়া সর্বজনীন দুর্গা মন্দিরসংলগ্ন ৩৭ শতাংশ জমি নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত। এ নিয়ে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের একাংশ মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করার পর প্রয়াত সেবায়েত ও সাবেক সভাপতি নারায়ণ চন্দ্র মণ্ডলের পরিবারের সদস্যরা সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন।
গত ১০ সেপ্টেম্বর মন্দিরের সামনে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েক শতাধিক নারী-পুরুষ মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন। তাঁদের অভিযোগ, প্রায় ৪০ বছরের পুরোনো মন্দিরটির জমির একটি অংশ নারায়ণ চন্দ্র মণ্ডলের পরিবারের সদস্যরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
বিক্ষোভকারীদের আরও অভিযোগ, মন্দিরসংলগ্ন এলাকায় গরুর খামার, খড়ের মাচাসহ বিভিন্ন স্থাপনা করা হয়েছে। এমনকি মন্দিরের জমি বিক্রির চেষ্টাও চলছে বলে তাঁরা দাবি করেন। মন্দিরের জমি নিশ্চিত করা এবং নির্বিঘ্নে পূজা-অর্চনার পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেন তাঁরা।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে নারায়ণ চন্দ্র মণ্ডলের পরিবার। পরদিন নিজেদের বাড়িতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তাঁর ছেলে বৃন্দাবন মণ্ডল দাবি করেন, ২০০০ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁর বাবার নামে ৯৯ বছরের জন্য ওই জমির কবুলিয়াত দেয়।
তাঁর দাবি, ১৫৭ নম্বর চৌমুখা মৌজার ৬৯৮ ও ৭০২ নম্বর দাগে মোট ৩৭ শতাংশ জমি তাঁদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে বৈধভাবে ভোগদখল করে আসছে। এর একটি অংশে মন্দির রয়েছে এবং বাকি অংশ পরিবার ব্যবহার করছে।
বৃন্দাবন মণ্ডল বলেন, সরকারের দেওয়া জমি নিয়ে প্রশাসন যে সিদ্ধান্ত নেবে, তাঁরা তা মেনে নেবেন। তবে কোনো অসাধু ব্যক্তিকে জমি দখল করতে দেওয়া হবে না। মন্দিরের জমি দখলের অভিযোগকেও তিনি মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।
পরবর্তীতে বিরোধপূর্ণ জমি নিয়ে গ্রামবাসীর পক্ষে শ্রীদাম বিশ্বাস ফরিদপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারায় আবেদন করেন। আবেদনে বৃন্দাবন মণ্ডল, লিটন মণ্ডল ও সুমন মণ্ডলকে প্রতিপক্ষ করা হয়।
আদালতে দাখিল করা নথিতে ঘটনার তারিখ ও সময় হিসেবে ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রোববার সকাল আনুমানিক ১০টা উল্লেখ করা হয়েছে।
নথিতে বিরোধপূর্ণ জমির বিবরণে ১৫৭ নম্বর চৌমুখা মৌজার এসএ খতিয়ান নম্বর ১৭১-এর ৬৯৮ নম্বর দাগে ৩২ শতাংশ এবং এসএ খতিয়ান নম্বর ৩৪৫-এর ৭০২ নম্বর দাগে ৫ শতাংশ—মোট ৩৭ শতাংশ জমির কথা বলা হয়েছে।
আবেদনে অভিযোগ করা হয়, প্রতিপক্ষ ওই জমিতে প্রবেশ করে মন্দির সরানো ও বাড়িঘর নির্মাণের চেষ্টা করছেন। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়। একই সঙ্গে বিষয়টি তদন্ত এবং বিরোধপূর্ণ এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করা হয়।
আদালতের নথিতে দেওয়া নির্দেশনায় ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখ রয়েছে। সেখানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, ফরিদপুরের পদবির সিল ও স্বাক্ষর দেখা যায়। তবে নথির ছবিতে স্বাক্ষরকারী কর্মকর্তার নাম স্পষ্টভাবে পড়া যায়নি।
আদালতের নথি এবং মণ্ডল পরিবারের বক্তব্য—দুই জায়গাতেই বিরোধপূর্ণ জমির পরিমাণ ৩৭ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জমিটির কোন অংশ কতদিন ধরে মন্দিরের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, কবুলিয়াতের শর্ত কী এবং জমিতে কার কী ধরনের ব্যবহারিক অধিকার রয়েছে—বিরোধের মূল বিষয়গুলো সেখানেই।
আদালতের নির্দেশনা পাওয়ার পর নগরকান্দা থানার পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং দুই পক্ষের সঙ্গে কথা বলে।
নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসূল সামদানি আজাদ বলেন, আদালত থেকে একটি আদেশ পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে।
আসন্ন দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে পরিস্থিতি শান্ত রাখতে প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। বিরোধপূর্ণ জমি নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া চললেও পূজাকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়টিকেই এখন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।