তুলির শেষ আঁচড়, প্রতিমার সাজসজ্জা আর মণ্ডপ তৈরির ব্যস্ততায় এখন দম ফেলার ফুরসত নেই প্রতিমাশিল্পী ও পূজা আয়োজকদের। কোথাও চলছে প্রতিমায় রঙের শেষ কাজ, কোথাও মণ্ডপে আলোকসজ্জা ও ডেকোরেশনের প্রস্তুতি। পূজাকে ঘিরে কেনাকাটা, মেলা ও নানা আয়োজনের প্রস্তুতিও চলছে পুরোদমে। সব মিলিয়ে দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে সারাদেশে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজাকে ঘিরে এবার দেশজুড়ে বাড়তি উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। আয়োজকেরা বলছেন, শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। প্রতিমা তৈরি থেকে শুরু করে মণ্ডপের সৌন্দর্যবর্ধন সব কাজই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে চলছে দিন-রাত পরিশ্রম।
পঞ্জিকা অনুযায়ী, আগামী ১০ অক্টোবর মহালয়া পালনের মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হবে। এরপর ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হবে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। তবে এবারের দুর্গোৎসবে তিথির বিশেষ কারণে সপ্তমী দুই দিন স্থায়ী হওয়ায় উৎসবের আবহও দীর্ঘ হবে।
ষষ্ঠীতে দেবীর বোধন
১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠী। এদিন দেবী দুর্গার বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। বিভিন্ন মণ্ডপে পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ, ঢাকের বাদ্য আর ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে মুখর হয়ে উঠবে পূজামণ্ডপ। দেবীকে বরণ করে নিতে এরই মধ্যে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিচ্ছেন আয়োজকেরা।
সপ্তমীতে নবপত্রিকা স্থাপন
এবারের পূজায় বিশেষত্ব হলো সপ্তমী তিথি দুই দিন স্থায়ী হবে-১৭ ও ১৮ অক্টোবর। সপ্তমীর অন্যতম প্রধান আচার নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপন। এরপর শুরু হবে সপ্তমীর পূজা। তিথির কারণে এবার পূজার আনন্দ ও মণ্ডপকেন্দ্রিক আয়োজনের সময়ও কিছুটা বাড়ছে।
অষ্টমীতে অঞ্জলি ও সন্ধিপূজা
১৯ অক্টোবর মহাষ্টমী। দুর্গাপূজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর একটি অষ্টমী। এদিন সকালে বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভক্তরা দেবীর পায়ে পুষ্পাঞ্জলি দেবেন। অষ্টমীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আচার সন্ধিপূজা। অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এদিন অনেক মণ্ডপে কুমারী পূজারও আয়োজন করা হয়।
অষ্টমীর অঞ্জলি দিতে সকাল থেকেই পূজামণ্ডপগুলোতে ভক্তদের ভিড় বাড়বে বলে আশা করছেন আয়োজকেরা। নতুন পোশাক পরে পরিবার-পরিজন নিয়ে পূজামণ্ডপে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন অনেকে।
নবমীতে পূজা ও হোম-যজ্ঞ
২০ অক্টোবর মহানবমী। এদিন দেবীর নবমী বিহিত পূজার পাশাপাশি বিভিন্ন মণ্ডপে হোম-যজ্ঞ ও বিশেষ ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠিত হবে। অষ্টমীর ভক্তিময় পরিবেশের পর নবমীতে উৎসবের আমেজ আরও বাড়বে। অনেক মণ্ডপে এদিন বিশেষ প্রসাদ বিতরণ ও নানা আয়োজনও থাকবে।
দশমীতে বিজয়ার সুর
২১ অক্টোবর বিজয়া দশমী। পূজার শেষ দিনে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। দশমীর পূজা শেষে দর্পণ বিসর্জনসহ বিভিন্ন আচার পালন করা হবে। এরপর শোভাযাত্রার মাধ্যমে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে শারদীয় দুর্গোৎসব।
দেবীকে বিদায় জানানোর সময় পূজামণ্ডপগুলোতে যেমন থাকবে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, তেমনি থাকবে আনন্দ-বেদনার মিশ্র অনুভূতি। সিঁদুর খেলা, শুভেচ্ছা বিনিময় ও বিজয়ার প্রীতি বিনিময়ের মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে।
তবে এবার মণ্ডপ সাজাতে গিয়ে বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়েছেন আয়োজকেরা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং শ্রমিকদের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় ডেকোরেশনসহ পূজার বিভিন্ন খাতে খরচ বেড়েছে। অনেক মন্দির কমিটির বাজেট সীমিত থাকায় স্বল্প ব্যয়ের মধ্যেই সর্বোচ্চ সুন্দর আয়োজন করার চেষ্টা করছেন তারা। ডেকোরেটর মালিক তরুণ ভৌমিক বলেন, সবকিছুর দাম বাড়ার কারণে ডেকোরেশনের উপকরণের পাশাপাশি শ্রমিকদের মজুরিও বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় মন্দির কমিটিগুলোর বাজেট কিছুটা কম। তারপরও ধর্মীয় আবেগ ও উৎসবের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই সুন্দর ডেকোরেশন করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ব্যবসা-বাণিজ্যেও উৎসবের প্রভাব
দুর্গাপূজাকে ঘিরে শুধু পূজা আয়োজকদের মধ্যেই নয়, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মেলা আয়োজকদের মধ্যেও ব্যস্ততা বেড়েছে। পূজামণ্ডপের আশপাশে বিভিন্ন ধরনের দোকান, খাবারের স্টল ও মেলা বসানোর প্রস্তুতি চলছে। পোশাক, প্রসাধনী, খেলনা ও বিভিন্ন পণ্যের কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীরাও ভালো বেচাকেনার প্রত্যাশা করছেন। পূজার দিনগুলোতে দেশের বিভিন্ন মণ্ডপে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর সমাগম হবে বলে আশা করছেন আয়োজকেরা। পরিবার-পরিজন নিয়ে মণ্ডপে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন সাধারণ মানুষ। শিশু-কিশোরদের মধ্যেও রয়েছে বাড়তি আগ্রহ। ফলে পূজা শুরুর আগেই শহর থেকে গ্রাম সর্বত্র উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়েছে। সব মিলিয়ে এবার দুর্গাপূজাকে ঘিরে সারাদেশে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্রতিমাশিল্পীর তুলির শেষ আঁচড়, মণ্ডপের সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা ও নানা আয়োজন শেষ করার ব্যস্ততায় মুখর পূজামণ্ডপগুলো। মহালয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া দেবীপক্ষের আবহ ষষ্ঠী থেকে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী পেরিয়ে বিজয়া দশমীর বিসর্জনে গিয়ে শেষ হবে। ছয় দিনের এই দীর্ঘ উৎসবে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি আনন্দ, সম্প্রীতি ও মিলনমেলায় মুখর হয়ে উঠবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল।
অরণ্য/ রূপক/ - ০৮.১০.২৬