দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ থাকলেও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মনে করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় বর্তমান নির্বাচিত সরকারের সময়ে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তাঁর দাবি, গত এক বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে খুন, ডাকাতি, দস্যুতা, দাঙ্গা, নারী ও শিশু নির্যাতন, অপহরণ, পুলিশ আক্রান্ত এবং দ্রুত বিচার আইনের মামলাসহ ১০ ধরনের অপরাধের মধ্যে আট ধরনের ঘটনাই কমেছে। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে দেয়া স্বাক্ষাতকারে তিনি এসব দাবী জানান।
আইজিপির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০টি মামলা হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে মামলার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৮ হাজার ৬৭৮টি। অর্থাৎ এক বছরে মামলা বেড়েছে ১৪ হাজার ৮০২টি। পুলিশের ব্যাখ্যা, থানায় মামলা করার সুযোগ বেড়েছে এবং মাদকবিরোধী অভিযানে বেশি মাদক উদ্ধার হওয়ায় মামলার সংখ্যাও বেড়েছে।
তবে অপরাধ কমার এই দাবির পাশাপাশি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক হামলা, ভাঙচুর, দখল, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ককটেল বিস্ফোরণ ও সহিংসতার ঘটনাগুলোও পুলিশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। বিশেষ করে মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার, ইসিবি চত্বরের কাছে নিউগিনি প্রপার্টিজ, আদাবর ও মোহাম্মদপুরের সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ঘটনাগুলো পুলিশের আগাম প্রতিরোধব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
আইজিপি স্বীকার করেছেন, এসব ঘটনায় পুলিশ অপরাধ সংঘটনের আগে যথাযথভাবে প্রতিরোধ করতে পেরেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাঁর মতে, অপরাধ সংঘটনের পর মামলা নেওয়া, আসামি গ্রেপ্তার ও আলামত উদ্ধার পুলিশের দায়িত্বের একটি অংশ। একই সঙ্গে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়াও পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
রাড্ডা সেন্টারে হামলার মামলায় এখন পর্যন্ত ১৯ জন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিউগিনি প্রপার্টিজের ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন আটজন এবং আদাবরের ঘটনায় ১১ জন। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়াও চলছে। তবে আইজিপির বক্তব্যে স্পষ্ট, শুধু গ্রেপ্তার দিয়ে পুলিশের সাফল্য বিচার করতে চান না তিনি। অপরাধ কতটা কমেছে, পুনরায় অপরাধে জড়িত ব্যক্তির সংখ্যা, তদন্ত ও অভিযোগপত্রের মান, আদালতে মামলার ফল, নাগরিকের অভিযোগ এবং পুলিশের সাড়া দেওয়ার সময় এ সবকিছুকেই সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখতে চান তিনি।
ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনাগুলোকেও গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে পুলিশ। আইজিপির দাবি, অধিকাংশ ঘটনায় জড়িতদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে এবং অনেককে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার নানা প্রচারণা থাকলেও বাস্তবে সেই মাত্রার সক্ষমতা সংশ্লিষ্টদের নেই এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় পুলিশ তা মোকাবিলা করতে সক্ষম।
অপরাধ দমনে পুলিশ এখন প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা থেকে প্রতিরোধমূলক পুলিশিংয়ের দিকে যাচ্ছে বলেও জানিয়েছেন আইজিপি। কমিউনিটি পুলিশিংয়ের আওতায় মাদক, কিশোর গ্যাং, মব সহিংসতা, ইভ টিজিং, বাল্যবিবাহ, নারী ও শিশু নির্যাতন, নিখোঁজ শিশু এবং সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে দেশজুড়ে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অপরাধপ্রবণ এলাকা বা ‘হটস্পট’ চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট ইউনিটকে নির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
তবে পুলিশের ঘুরে দাঁড়ানোর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা জনআস্থা ফিরিয়ে আনা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশ বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়েছিল বলে আইজিপি নিজেই স্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, ধীরে ধীরে শৃঙ্খলা ও মনোবল ফিরে এসেছে। ক্ষতিগ্রস্ত অধিকাংশ থানা সংস্কার করা হয়েছে, নতুন যানবাহন যুক্ত হয়েছে এবং লুট হওয়া অধিকাংশ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, এখনো প্রায় ১ হাজার ২০০ অস্ত্র বাইরে রয়েছে।
পুলিশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে আইজিপি চিহ্নিত করেছেন জনআস্থার ঘাটতিকে। তাঁর মূল্যায়ন, আস্থা তৈরির ক্ষেত্রে পুলিশ ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পথ অতিক্রম করেছে; বাকি অংশ অর্জন করতে হবে কাজের মাধ্যমে। অর্থাৎ পুলিশের সক্ষমতার পাশাপাশি জনগণ পুলিশকে কতটা নিরপেক্ষ, পেশাদার ও আইননির্ভর প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে পারছে, সেটিই হবে ভবিষ্যতের বড় সূচক।
থানাকে জনগণের আস্থার জায়গায় পরিণত করতে ‘জিরো কমপ্লেন’ বা অভিযোগশূন্য থানার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। মামলা, সাধারণ ডায়েরি বা অন্য কোনো অভিযোগ নিয়ে থানায় যাওয়া মানুষ যেন সম্মানজনক আচরণ পান এবং তাঁর অভিযোগ যথাযথভাবে নথিভুক্ত হয়—এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মামলা গ্রহণের ক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার হচ্ছে কি না, সেটিও নজরদারিতে রাখার কথা বলেছেন আইজিপি।
পুলিশের ভেতরের জবাবদিহির বিষয়টিও সাক্ষাৎকারে গুরুত্ব পেয়েছে। ঘুষ, চাঁদাবাজি, হেফাজতে নির্যাতন কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৩৫ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২৫ জন চাকরিচ্যুত, ২৭ জন অব্যাহতি পেয়েছেন, ২৭ জন বিভিন্ন ধরনের শাস্তি পেয়েছেন, ৯ জন সাময়িক বরখাস্ত এবং ২২ জনকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রেও প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণের কথা বলেছেন আইজিপি। তাঁর মতে, শুধু মাঠপর্যায়ের সদস্য নয়, কোনো ঘটনায় নির্দেশ, পরিকল্পনা, কমান্ড বা তদারকি পর্যায়ে অপরাধমূলক দায়ের প্রমাণ পাওয়া গেলে সেটিও তদন্তের আওতায় আসতে হবে।
পুলিশে রাজনৈতিক প্রভাব ও পদায়নে তদবির বন্ধেও নতুন পদ্ধতির কথা তুলে ধরেছেন আইজিপি। পদায়নের ক্ষেত্রে কমিটি গঠন, তদবিরকারীদের পরিচয় যাচাই এবং কর্মকর্তাদের যোগ্যতা ও পটভূমি বিবেচনার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ওসি থেকে পুলিশ সুপার এবং তদূর্ধ্ব পর্যায়ের পদে পদায়নের জন্য ‘ফিটলিস্ট’ তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে আইজিপির বক্তব্যে পুলিশের ঘুরে দাঁড়ানোর একটি চিত্র উঠে এসেছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রকৃত মূল্যায়ন শুধু পুলিশের পরিসংখ্যান দিয়ে সম্ভব নয়। নাগরিকের নিরাপত্তাবোধ, থানায় সেবা পাওয়ার অভিজ্ঞতা, অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশের সক্ষমতা এবং আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতাই শেষ পর্যন্ত আস্থার মাপকাঠি।
আগামী ছয় মাসে জনগণের আস্থা অর্জন, পুলিশের সক্ষমতা ও মনোবল বাড়ানো এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন আইজিপি। তাঁর নিজের ভাষায়, পুলিশের নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো ফলাফলের দায় নেওয়া, ঘাটতি চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন করা। এখন সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলনই হবে পুলিশের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
অরণ- ০৮/১০/২৬