গ্রেপ্তারের সময় দুই যুবকের কারও কাছেই অস্ত্র ছিল না—এমন দাবি করে কুষ্টিয়া জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) বিরুদ্ধে তাদের অস্ত্র দিয়ে ফাঁসানোর অভিযোগ তুলেছে দুই পরিবার। গ্রেপ্তারের সময়কার ভিডিও ফুটেজেই এর প্রমাণ রয়েছে বলে দাবি করেছেন স্বজনেরা। পরে তাদের কাছ থেকে পিস্তল ও গুলি উদ্ধারের দাবি করে অস্ত্র মামলা দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে বুধবার কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন গ্রেপ্তার দুই যুবকের পরিবারের সদস্যরা। সংবাদ সম্মেলনে আব্দুল্লাহর স্ত্রী মিথিলা খাতুনের লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন আরিফুলের ভাগনি ইতি খাতুন।
গ্রেপ্তার দুই যুবক হলেন কুমারখালী উপজেলার শালঘর মধুয়া গ্রামের হাসেন আলী গোপালের ছেলে আরিফুল ইসলাম আরিফ (২৮) এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার দুর্বাচারা গ্রামের রাহাদ আলীর ছেলে আব্দুল্লাহ (২৮)।
লিখিত বক্তব্যে মিথিলা খাতুন বলেন, গত ৬ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন গণমাধ্যমে ‘কুষ্টিয়ায় দুই পিস্তল ও ১৮ রাউন্ড গুলিসহ আটক ২’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সেখানে আরিফুল ও আব্দুল্লাহকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়। তবে পরিবারের দাবি, আটকের সময় তাদের কারও কাছেই কোনো অস্ত্র ছিল না।
মিথিলা খাতুনের ভাষ্য, ডিবি পুলিশের এসআই জনি আরিফুল ও আব্দুল্লাহকে আটক করার সময় তাদের কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না। গ্রেপ্তারের সময়কার ভিডিও ফুটেজ তাদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
পরিবারের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়, আরিফুল ও আব্দুল্লাহর সঙ্গে দুর্বাচারা গ্রামের জাহাঙ্গীর কবির লিপ্টনের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। সেই বিরোধের জেরে লিপ্টন ও ‘টাইগার মামুন’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তি ডিবি পুলিশকে ব্যবহার করে তাদের আটক করিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন মিথিলা খাতুন।
তার দাবি, প্রথমে বংশীতলা মোড় থেকে আরিফুল ইসলামকে আটক করা হয়। পরে ডিবি পুলিশের সদস্যরা দুর্বাচারা বাজারে গিয়ে আব্দুল্লাহকে জনসম্মুখে আটক করেন। এ সময় স্থানীয়রা বাধা দিলে পুলিশ কোনো অস্ত্র দেখাতে পারেনি এবং কেন তাকে আটক করা হচ্ছে, সে বিষয়েও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মিথিলা খাতুন বলেন, তার স্বামীর বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। এরপরও তাকে আটক করে অস্ত্র মামলায় আদালতে পাঠানো হয়েছে—এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে জাহাঙ্গীর কবির লিপ্টন ও ‘টাইগার মামুন’-এর বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ তোলা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অপহরণ, চাঁদাবাজি, অস্ত্র দিয়ে ফাঁসানো এবং সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করেন মিথিলা খাতুন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
লিখিত বক্তব্যে আরও দাবি করা হয়, ২০২৫ সালের ৬ জুন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রসহ আটক হওয়ার পর লিপ্টন জামিনে বের হয়ে আত্মগোপনে যান। এরপর আত্মগোপনে থেকেই প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগসাজশ করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছেন বলেও অভিযোগ করা হয়।
এ ছাড়া ‘টাইগার মামুন’ ১৭টি মামলার আসামি বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়। প্রশাসনকে ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তিকে হয়রানি ও অর্থ আদায়ের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে তোলা হয়।
আরিফুল ইসলামকে ২০২৩ সালের দিকে ঢাকায় র্যাব একাধিক অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছিল বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন স্বজনেরা। পরে এলাকাবাসীর মানববন্ধনের পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং শুধু ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধারের মামলায় আদালতে পাঠানো হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র তাদের কাছে রয়েছে বলেও জানানো হয়।
পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার দুই যুবককে আইনি সহায়তা দিয়ে মুক্তির ব্যবস্থা, গ্রেপ্তারকারী ডিবি কর্মকর্তার ভূমিকা তদন্ত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরিফুলের স্ত্রী বেবি, বড় ভাবী মিনারা বেগম, মা রাবেয়া খাতুন, বড় বোন নাছিমা খাতুন, রূপসী খাতুনসহ দুই পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় কুষ্টিয়ায় কর্মরত বিভিন্ন প্রিন্ট, অনলাইন ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরাও উপস্থিত ছিলেন।
তবে পরিবারের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে কুষ্টিয়া জেলা গোয়েন্দা শাখা। কুষ্টিয়া ডিবির ওসি ফারুকুল ইসলাম ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, এসব তথ্য ভিত্তিহীন। তারা ভ্রান্ত তথ্য দিচ্ছেন।
ফলে গ্রেপ্তারের সময় দুই যুবকের কাছে অস্ত্র ছিল কি না, পরবর্তীতে অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারের ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে এবং পরিবারের দাবি করা ভিডিও ফুটেজে কী রয়েছে—এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তেই প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হতে পারে।