বরগুনার বহুল আলোচিত চাঞ্চল্যকর রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর ছয় বছর ধরে কারাগারে রয়েছেন সেই আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি।
উচ্চ আদালতে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়ায় বরিশাল কারাগারের কনডেম সেলে দিন কাটছে তাঁর। স্বজনদের সঙ্গে মাসে একবার দেখা করার সুযোগ পান তিনি। কারাগারে ইবাদত-বন্দেগির মধ্যেই তাঁর অধিকাংশ সময় কাটছে। অন্যদিকে, উচ্চ আদালতে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনসংক্রান্ত ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি কবে শেষ হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
২০১৯ সালের ২৬ জুন দুপুরে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির মধ্যে রিফাতের স্ত্রী মিন্নিসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত।
রায়ের পর ওই বছরের ৪ অক্টোবর মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। একই বছর দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে মিন্নিসহ ছয় আসামি পৃথক আপিল করেন। পরে অসুস্থতা ও নারী বন্দি হিসেবে বিবেচনাসহ বিভিন্ন যুক্তিতে মিন্নির পক্ষে জামিন আবেদন করা হয়।
বর্তমানে উচ্চ আদালতে ১ হাজার ২৬৫টি ডেথ রেফারেন্স শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। কয়েক বছর আগে এ সংখ্যা ছিল ৮৪৩টি। ডেথ রেফারেন্স আদালতের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির যুগান্তরকে জানান, বর্তমানে ২০১৯ সালে হাইকোর্টে আসা ডেথ রেফারেন্সগুলোর শুনানি চলছে। রিফাত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্সটি কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা খোঁজ নিয়ে জানানো সম্ভব হবে।
জামিন আবেদনও শুনানির অপেক্ষায়
মিন্নির আইনজীবী জেড আই খান পান্না যুগান্তরকে বলেন, রিফাত হত্যায় মিন্নির সম্পৃক্ততা নিয়ে সাক্ষীদের বক্তব্যে ভিন্নতা, কারাগারে তাঁর অসুস্থতা এবং নারী বন্দি হিসেবে বিবেচনার বিষয়গুলো তুলে ধরে ২০২২ সালের ১৬ অক্টোবর হাইকোর্টে জামিন আবেদন করা হয়।
২০২৩ সালের ১১ জানুয়ারি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ আবেদনটির শুনানি করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে অন্য একটি বেঞ্চে আবেদনটি উপস্থাপন করা হলে আদালত শুনানি মুলতবি করেন। এরপর আবেদনটি আর শুনানির তালিকায় ওঠেনি বলে জানান তিনি।
সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির জামিন পাওয়ার নজির নেই। আসামিপক্ষের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা শুনানিতে সময় চাইলে আদালত তা মুলতবি করেন।
দীর্ঘদিন কনডেম সেলে থাকার প্রশ্ন
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃত্যুদণ্ডের মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগলে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বছরের পর বছর কনডেম সেলে রাখার বিষয়টি মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তাঁদের যুক্তি, বিচারিক আদালতের রায়ের পরও উচ্চ আদালতে আপিল ও অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া চলতে থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় কনডেম সেলে থাকার পর আপিল বিভাগে আসামি খালাসও পান।
তাঁদের মতে, চূড়ান্ত বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগলে কনডেম সেলের বাইরে রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। কারণ, আপিল ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডের রায় পরিবর্তিত হওয়ার সুযোগ থাকে।
মেয়েকে নির্দোষ দাবি বাবার
মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর যুগান্তরকে বলেন, ষড়যন্ত্র করে তাঁর মেয়েকে মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। এ ঘটনায় সাবেক সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর হাত রয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য উল্লেখ করা হয়নি।
মিন্নির শারীরিক অবস্থা ভালো নয় দাবি করে তাঁর বাবা বলেন, কারা কর্তৃপক্ষ মাসে একবার মেয়ের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেয়। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আদালত অন্তত তাঁর জামিনের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন।
মিন্নির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাবা-মা ও স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং মামলা পরিচালনার সুবিধার্থে তাঁকে কাশিমপুর কারাগার থেকে বরিশাল কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। কারা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল কারাগারের কনডেম সেলে বর্তমানে একমাত্র নারী বন্দি মিন্নি।
কারাগারে ইবাদত-বন্দেগিতে সময় কাটে
কারাবিধি অনুযায়ী, কনডেম সেলের বন্দিদের দুই সেট করে পোশাক দেওয়া হয় এবং তাঁদের চলাফেরার সুযোগ সীমিত থাকে। মাসে একবার স্বজনদের সঙ্গে দেখা করার পাশাপাশি সপ্তাহে একবার নির্ধারিত সময়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সুযোগ রয়েছে।
মিন্নিরও বাইরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ সীমিত। বাবা-মা দেখা করতে এলে তাঁদের সঙ্গেই কথা বলার সুযোগ পান তিনি। কারা কর্তৃপক্ষের সূত্র জানায়, মিন্নি সাধারণত চুপচাপ থাকেন এবং নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। কারাগারে তাঁর আচরণ সন্তোষজনক এবং এখন পর্যন্ত কোনো অপরাধে জড়িত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
মামলার ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জামিন আবেদনের শুনানি শেষ না হওয়ায় মিন্নির আইনি প্রক্রিয়া এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে তাঁর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে উচ্চ আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই তাকিয়ে আছেন স্বজনেরা।
অরণ্য-১০.১০.২৬