মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ এবং ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় নিয়ে দেওয়া এক বক্তব্যের মাধ্যমে নতুন করে আন্তর্জাতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। সাম্প্রতিক এক জনসভায় তিনি দাবি করেন, ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্র যে পরিমাণ অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়েছে, তা দিয়েই ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানের ব্যয় বহুবার মেটানো সম্ভব হয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, “ভেনেজুয়েলায় আমরা খারাপ করিনি। আমরা সেখান থেকে এত বেশি তেল নিয়েছি যে, ইরান যুদ্ধের খরচ প্রায় ২৫ বার উঠে এসেছে।” তার এই মন্তব্য প্রকাশের পরপরই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গন, জ্বালানি বাজার এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের বক্তব্য শুধু একটি রাজনৈতিক মন্তব্য নয়; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের জ্বালানি কৌশল ও বৈদেশিক নীতির একটি ইঙ্গিত বহন করে। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল সম্পদকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটনের আগ্রহ নতুন নয়। লাতিন আমেরিকার এই দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল মজুদের অধিকারী হওয়ায় বহু বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই ট্রাম্পের এমন বক্তব্যকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, একটি দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে প্রাপ্ত অর্থনৈতিক সুবিধাকে সরাসরি যুদ্ধ ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিরল ঘটনা। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ কতটা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত, সেটিও স্পষ্ট হয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করছেন, ট্রাম্প তার বক্তব্যের মাধ্যমে নিজের প্রশাসনের জ্বালানি ও পররাষ্ট্রনীতিকে সফল হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন। তার আমলে ভেনেজুয়েলার তেল খাতকে ঘিরে নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক চাপ এবং অর্থনৈতিক কৌশল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল। একই সময়ে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানও বিশ্ব রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছিল।
এদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর পেন্টাগনের সাম্প্রতিক তথ্যে জানা গেছে, ইরানবিরোধী সামরিক কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি ব্যয় প্রায় ২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। তবে সামরিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, আনুষ্ঠানিক হিসাবের বাইরে যুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যয় যোগ করলে প্রকৃত খরচ আরও অনেক বেশি হতে পারে। ট্রাম্পের বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনাও তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা বলছেন, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রাকৃতিক সম্পদকে যুদ্ধ পরিচালনার অর্থনৈতিক উৎস হিসেবে প্রকাশ্যে উল্লেখ করা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একই সঙ্গে এটি বৈশ্বিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক আধিপত্যের প্রশ্নটিকেও নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন মার্কিন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের এমন বক্তব্য তার সমর্থকদের কাছে শক্ত অবস্থানের বার্তা দিলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তা নতুন বিতর্ক ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।