ভুয়া এলসিতে প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ
ভুয়া রপ্তানি আদেশ ও অতিরিক্ত ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে Premier Bank PLC-এর নারায়ণগঞ্জ শাখা থেকে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা পাচারের তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক-এর এক তদন্ত প্রতিবেদনে। এ ঘটনায় ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশ, স্থানীয় বাজারে আমদানিকৃত পণ্য বিক্রি এবং রাজস্ব ফাঁকির মতো গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্ত অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রিমিয়ার ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখার ২৯টি প্রতিষ্ঠান প্রকৃত রপ্তানি আদেশের তুলনায় ১০০ থেকে ৩৭৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খুলেছে। যদিও বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী, প্রকৃত রপ্তানি আয়ের সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত এলসি খোলার সুযোগ রয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত এলসির সুবিধা নিয়ে প্রায় ৯৬৮ মিলিয়ন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১০ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, এসব এলসির বিপরীতে আমদানি করা কাঁচামাল রপ্তানি খাতে ব্যবহার করা হয়নি। বরং সেগুলোর বড় অংশ স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও ডিউটি ড্র-ব্যাক সুবিধার অপব্যবহারের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির ঘটনাও শনাক্ত হয়েছে।
প্রতিবেদনে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়েও গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই বছরের পর বছর এসব লেনদেন পরিচালনা করা হয়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রয়োজনীয় তথ্যও জানানো হয়নি। তদন্তে উঠে এসেছে, একই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রপ্তানি আদেশ দেখিয়ে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা হয়েছে। এতে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সক্রিয় সহযোগিতা ছিল বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অনিয়মের চিত্রে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বড় ধরনের অস্বাভাবিক তথ্যও পাওয়া গেছে। একটি প্রতিষ্ঠান মাত্র ৬২ মিলিয়ন ডলারের প্রকৃত রপ্তানি করলেও তাদের নামে ২৩১ মিলিয়ন ডলারের ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা হয়েছে। আবার অন্য একটি প্রতিষ্ঠান ১৩ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি দেখিয়ে প্রায় ৯৯ মিলিয়ন ডলারের এলসি সুবিধা নিয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পুরো সময়জুড়ে একই শাখায় দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা। শাখা ব্যবস্থাপক মো. শহীদ হাসান মল্লিক টানা প্রায় ১০ বছর একই শাখায় দায়িত্বে ছিলেন, যা ব্যাংকিং নীতিমালার পরিপন্থী। ঘটনাটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, তাদের অজান্তেই অনেক এলসি খোলা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কাগজপত্র গোপন রেখে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে স্বাক্ষর নিয়েছে এবং রপ্তানি আয়ের অর্থ আটকে রেখে বিভিন্ন অনিয়ম করেছে। এদিকে তদন্ত প্রতিবেদন ২০২৩ সালে প্রস্তুত হলেও প্রায় তিন বছর পর চলতি বছরের মার্চে নারায়ণগঞ্জ শাখার অথরাইজড ডিলার (এডি) লাইসেন্স বাতিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে ও বাইরে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সে সময় প্রভাবশালী মহলের চাপ থাকায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে নতুন বোর্ড গঠনের পর বিষয়টি নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বর্তমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতি, ফরেনসিক অডিট ও আইনি পদক্ষেপের প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে বিষয়টি Anti-Corruption Commission-কেও জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে ট্রেড ফাইন্যান্সভিত্তিক অনিয়মের বড় অংশই ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে হয়ে থাকে। তাই শুধু লাইসেন্স বাতিল নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তা, ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।