ঠাকুরগাঁওয়ে পানিতে ডুবে গেছে শত শত বিঘা বোরো ধান,দু-চিন্তার ছাপ কৃষকের মুখে
অতিরিক্ত বৃষ্টিতে ঠাকুরগাঁওয়ে এবার প্রথমবারের মতো পানির নিচে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ বোরো ধানের ক্ষেত। বুকসমান পানিতে নেমে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই ধান কেটে ঘরে তোলার চেষ্টা করছেন কৃষকরা। অনেকের ভাষায়, ‘এই ধান তুলতে না পারলে সারা বছর পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে।’
সোমবার সকালে সদর উপজেলার ভেলাজান, রহিমানপুরের বিল নড়লই ও রায়পুরের বেংরোল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নিচু জমির অধিকাংশ বোরো ধান পানিতে ডুবে আছে। কোথাও কোথাও ধানের শীষ পর্যন্ত পানির নিচে চলে গেছে। কৃষকরা পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে ধান কাটছেন, আবার কেউ কেউ হাঁড়ি-পাতিল কিংবা ভাসমান পাত্র ব্যবহার করে কাটা ধান জমি থেকে সরিয়ে নিচ্ছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বৈশাখের শুরু থেকেই ঠাকুরগাঁওয়ে প্রায় প্রতিদিন বৃষ্টি হচ্ছে। গত তিন দিনের টানা বর্ষণে জেলার শত শত বিঘা জমির ধান তলিয়ে যায়। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের কৃষক ও দিনমজুর পরিবারগুলো।
সদর উপজেলার ভেলাজান হীরামনপাড়া গ্রামের দিনমজুর টিয়াবুল রায় কষ্ট করে ১৪ কাঠা জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন। কিন্তু অতিবৃষ্টিতে সেই ধান এখন পানির নিচে। ছয় সদস্যের পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি। বুকসমান পানিতে নেমে ধান কাটতে কাটতে তিনি বলেন, “ডুবে ডুবে ধান না কাটলে সারা বছর খাব কী!”
একই এলাকার কৃষক সোলেমান আলীর দুই বিঘা জমির ধানও পানিতে তলিয়ে গেছে। তিনি বলেন, “এখন চিন্তা করছি, নিজেরা কী খাব আর ধারদেনা কীভাবে শোধ করব।”
দক্ষিণ ভেলাজানের কৃষক আবু রায়হান বলেন, এমন আবহাওয়া তিনি আগে কখনও দেখেননি। তার ভাষায়, “বৈশাখেই যেন বর্ষা শুরু হয়ে গেছে। সরকার যদি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে না দাঁড়ায়, তাহলে আমাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।”
কৃষকদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে জোঁকের উপদ্রব। পানিতে নেমে ধান কাটতে গিয়ে অনেকেই জোঁকের কামড়ে আহত হচ্ছেন। এজন্য হাত-পা মোটা কাপড়ে ঢেকে কাজে নামছেন তারা। তারপরও শরীরের বিভিন্ন স্থানে জোঁকের কামড় থেকে রেহাই মিলছে না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, জেলায় সাত উপজেলায় প্রায় ৬২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। তবে অতিরিক্ত পানির কারণে অনেক এলাকায় পাকা ধানও কাটা যাচ্ছে না। ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. মাজেদুল ইসলাম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দ্রুত ডুবে যাওয়া ধান কেটে ঘরে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সময়মতো ধান সংগ্রহ করতে পারলে কৃষকদের ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় নতুন আরেক সংকটে পড়েছেন কৃষকরা। কাটা ধান শুকাতে না পারায় অনেকেই দুশ্চিন্তায় আছেন। শুধু বোরো ধান নয়, অতিবৃষ্টিতে ভুট্টা, মরিচ ও বিভিন্ন শাকসবজির ক্ষেতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের আশঙ্কা, বৃষ্টির পানি আরও বাড়লে নিচু এলাকার অবশিষ্ট ধান ঘরে তোলা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।