সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বাংলাদেশি প্রবাসীরা। ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরতে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসেও অনেকে সৌদি আরব যেতে পারছেন না। অন্যদিকে, দেশে ফেরার অপেক্ষায় রিয়াদে আটকে পড়েছেন কয়েক হাজার বাংলাদেশি। কবে ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে দুই দিকের যাত্রীদের মধ্যেই অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
রোববার (১১ অক্টোবর) ঢাকা থেকে রিয়াদগামী একাধিক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স, সৌদিয়া, রিয়াদ এয়ার ও শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বাতিলের ঘটনায় নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে ফেরা নিয়ে উদ্বিগ্ন প্রবাসীরা।
ছুটি কাটিয়ে রোববার দুপুরে সৌদি আরবে ফেরার কথা ছিল এক প্রবাসীর। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নির্ধারিত সময়ে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর জানতে পারেন, তাঁর ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। পরবর্তী ফ্লাইট কখন ছাড়বে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্যও পাননি তিনি।
ওই যাত্রী বলেন, হঠাৎ ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন। নির্ধারিত সময়ে সৌদি আরবে পৌঁছাতে না পারলে কর্মস্থলে নানা সমস্যার মুখে পড়তে পারেন। পরবর্তী ফ্লাইটের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত জানানো হলে যাত্রীদের দুর্ভোগ কমত।
একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন আরও অনেক প্রবাসী। সময়মতো কাজে যোগ দিতে না পারলে চাকরি, ভিসার মেয়াদ ও নিয়োগকর্তার শর্ত নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার পর প্রাণহানি ও বহু মানুষ আহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত হওয়ায় সৌদি আরবের আকাশপথে ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হয়েছে।
বিমানবন্দর সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার রাত থেকে রোববার পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ রুটে অন্তত ১০টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে ঢাকায় সৌদিগামী প্রায় তিন হাজার যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পাশাপাশি রিয়াদে দেশে ফেরার অপেক্ষায় আটকা পড়েছেন প্রায় চার হাজার বাংলাদেশি যাত্রী।
রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ১২ অক্টোবর বাংলাদেশ সময় ভোর ৩টা পর্যন্ত বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এরপর কখন ফ্লাইট চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না যাত্রীদের।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলো তথ্য দিচ্ছে। যাত্রীদের বিমানবন্দরে আসার আগে নিজ নিজ এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা ও যাত্রার সময় নিশ্চিত হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, সৌদি আরবে পৌঁছাতে বিকল্প রুট খুঁজছেন অনেকে। তবে সেখানেও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। এক যাত্রী জানান, ভারতের মুম্বাই হয়ে সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের টিকিট কেটেছিলেন তিনি। কিন্তু ট্রানজিট ও ফ্লাইট বাতিলের খবর পাওয়ায় তাঁর যাত্রা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। অন্য যাত্রীরাও ঢাকা-মদিনা ও ঢাকা-জেদ্দা রুটে টিকিট পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
বিকল্প রুটে টিকিটের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি আর্থিক চাপের মুখে পড়েছেন যাত্রীরা। এসব পথে যাত্রা করেও শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবে পৌঁছানো যাবে কি না, তা নিয়ে নিশ্চয়তা নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভিসার মেয়াদ এবং নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা।
ফ্লাইট বাতিলের কারণে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় আসা যাত্রীরাও বিপাকে পড়েছেন। অনেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বিমানবন্দরে এসে এখন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন—বাড়ি ফিরে যাবেন, নাকি পরবর্তী ফ্লাইটের অপেক্ষায় ঢাকায় থাকবেন।
টিকিটের তারিখ পরিবর্তন, অর্থ ফেরত পাওয়া ও বিকল্প ফ্লাইটে যাত্রার নিয়ম সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য না থাকায় অনেককে এয়ারলাইন্সের কাউন্টারে যোগাযোগ করতে দেখা গেছে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁরা।
এদিকে, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিমানবন্দর ব্যবহার না করতে বিমান সংস্থা ও যাত্রীদের সতর্ক করেছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ১১ অক্টোবর দেওয়া নতুন সতর্কবার্তার পর সৌদি আরবের আকাশপথের নিরাপত্তা ও ফ্লাইট চলাচল নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
সব মিলিয়ে, রিয়াদে বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সৌদি আরবে কর্মস্থলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা এবং দেশে ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকা—উভয় পক্ষের বাংলাদেশি প্রবাসীরাই অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পাশাপাশি ফ্লাইটের সময়সূচি, টিকিট পরিবর্তন ও অর্থ ফেরতের বিষয়ে দ্রুত স্পষ্ট নির্দেশনা চান ভুক্তভোগীরা।