রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারের মনসুর খান প্লাজায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ কাটেনি। ভবনের বিভিন্ন তলায় থাকা দোকান ও গোডাউনে মজুত পণ্যের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারছেন না তারা। নিরাপত্তার কারণে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে না পেরে নিচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও তাঁদের স্বজনরা। কারও গোডাউনে রয়েছে প্রায় ৪০ লাখ টাকার ব্যাগ, কারও দোকানে জমা ছিল দীর্ঘদিনের পুঁজি। সব হারানোর আশঙ্কায় অনিশ্চয়তায় কাটছে তাঁদের সময়।
সোমবার (১২ অক্টোবর) বিকেলে মনসুর খান প্লাজায় আগুন লাগে। প্রায় ১২ ঘণ্টা পর মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ভোর ৫টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে এরপরও ভবনের ওপরের তলা থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। ফলে দোকান ও গোডাউনে থাকা পণ্যের অবস্থা জানতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।
মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনের নিচে জড়ো হয়ে আছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও তাঁদের স্বজনরা। আগুনে মালামাল কতটা পুড়েছে, কতটা অক্ষত রয়েছে—এ নিয়ে কারও কাছেই নিশ্চিত তথ্য নেই।
### ৪০ লাখ টাকার ব্যাগ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রবিন
মনসুর খান প্লাজার ছয়তলার ডান পাশে ব্যবসায়ী মো. রবিনের গোডাউন। সেখানে প্রায় ৪০ লাখ টাকার ব্যাগ মজুত ছিল বলে জানান তিনি। আগুন ছয়তলায় লাগায় নিজের পণ্য রক্ষা পেয়েছে কি না, তা নিয়ে চরম উদ্বেগে রয়েছেন এই ব্যবসায়ী।
রবিন জানান, সাততলা ভবনটির পাঁচ, ছয় ও সাততলায় ব্যাগ ও কসমেটিকসের গোডাউন রয়েছে। নিচের তলাগুলোতে এসব পণ্যের দোকান। আগুন লাগার খবর পাওয়ার পর থেকে তিনি ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি।
তিনি বলেন, গোডাউনে প্রায় ৪০ লাখ টাকার ব্যাগ ছিল। সব পুড়ে গেলে তিনি আর্থিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়বেন।
রবিনের ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচ ও ছয়তলায় সাধারণত কেউ অবস্থান করেন না। পণ্য আনা-নেওয়ার প্রয়োজন হলে ব্যবসায়ীরা সেখানে যান। সোমবার বিকেল ৫টার দিকে নিচের একটি দোকানের কর্মচারীর মাধ্যমে আগুন লাগার খবর পান তিনি।
তাঁর দাবি, পাঁচ, ছয় ও সাততলা মিলিয়ে ৫০টির বেশি গোডাউন রয়েছে। প্রতিটিতে প্রায় ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকার পণ্য মজুত আছে। আগুন ছয় ও সাততলায় ছড়িয়ে পড়ায় এসব গোডাউনের মালিকদের মধ্যে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
### দোকানের অর্ধেক পণ্য সরাতে পেরেছেন আকাশ
ভবনটির চারতলায় কসমেটিকসের দোকান রয়েছে ব্যবসায়ী মো. আকাশের। তাঁর দোকানে প্রায় ১৬ থেকে ২০ লাখ টাকার পণ্য ছিল। আগুন লাগার পর দ্রুত কিছু মালামাল সরিয়ে নিতে পারলেও বাকি পণ্য রক্ষা করতে পারেননি বলে জানান তিনি।
আকাশের ভাষ্য, দোকানের প্রায় অর্ধেক মালামাল বের করতে পেরেছেন। বাকি অংশের ক্ষতি হয়েছে। আগুনের সময় পণ্য রক্ষার চেষ্টা করতে গিয়ে তাঁকেও ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে।
অন্যদিকে, ভবনটির ছয়তলায় ব্যাগের ব্যবসা রয়েছে খোরশেদ আলমের। আরিফ নামের এক ব্যক্তি জানান, ওই তলায় আগুন লাগায় খোরশেদের পণ্যের অবস্থা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
তবে সবার ক্ষতির পরিস্থিতি এক নয়। ভবনটির দোতলায় ছাতার ব্যবসা করেন জামাল হোসেন। তিনি জানান, আগুনে তাঁর কোনো ক্ষতি হয়নি।
আগুনের সূত্রপাত সম্পর্কে জামাল ধারণা প্রকাশ করে বলেন, ভবনের ওপরের তলায় কোনো কর্মচারীর ফেলে দেওয়া বিড়ি বা সিগারেটের উচ্ছিষ্ট থেকে আগুন লাগতে পারে। তবে আগুনের প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
### গোডাউনের দরজা খুললেই মিলবে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব
ভবনের অন্য গোডাউনগুলোর মালিকরাও একই অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। দীর্ঘ সময় ধরে আগুন জ্বলতে থাকায় বিশেষ করে ছয় ও সাততলায় মজুত পণ্য নিয়ে তাঁদের আশঙ্কা বেশি। তবে ভেতরে প্রবেশ করে মালামাল পরীক্ষা করতে না পারায় প্রকৃত ক্ষতির হিসাব এখনো পাওয়া যাচ্ছে না।
ব্যবসায়ীদের মতে, গোডাউনের দরজা খুলে ভেতরের অবস্থা দেখার পরই বোঝা যাবে কতটুকু পণ্য রক্ষা পেয়েছে। এর আগে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা কঠিন।
### বন্ধ আশপাশের ১০ থেকে ১৫ ভবন, ক্ষতির মুখে অন্য ব্যবসায়ীরাও
মনসুর খান প্লাজায় অগ্নিকাণ্ডের পর নিরাপত্তার কারণে আশপাশের আরও ১০ থেকে ১৫টি ভবন বন্ধ করে দেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব ভবনে কসমেটিকসসহ বিভিন্ন পণ্যের দোকান রয়েছে। ফলে আগুনের প্রভাব পড়েছে আশপাশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও।
পাশের একটি ভবনে কসমেটিকসের ব্যবসা করেন মোহাম্মদ সাইদুর রহমান। তিনি জানান, সোমবার বিকেল থেকে তাঁদের দোকান বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘ সময় ব্যবসা বন্ধ থাকায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তাঁরা।
সাইদুর রহমান বলেন, দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তাঁরা আবার দোকান খুলে ব্যবসা শুরু করতে পারবেন।
### প্রায় ১২ ঘণ্টার চেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে আগুন
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বিকেল ৫টা ৪ মিনিটে মনসুর খান প্লাজায় আগুন লাগার খবর পাওয়া যায়। আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট। মঙ্গলবার ভোর ৫টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের অবসান হয়নি। তাঁদের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দোকান ও গোডাউনে থাকা পুঁজির কতটুকু রক্ষা পেয়েছে। ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে মালামাল পরীক্ষা করার সুযোগ না পাওয়া পর্যন্ত এই প্রশ্নের উত্তর মিলছে না।
দীর্ঘদিনের ব্যবসা, সঞ্চয় ও বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করে যাঁদের জীবিকা, তাঁদের কাছে এই অপেক্ষা শুধু ক্ষয়ক্ষতির হিসাব জানার নয়; বরং ব্যবসা টিকিয়ে রাখার অনিশ্চিত ভবিষ্যতেরও।