জয়পুরহাটে চার কোটি টাকার কারখানা, কর্মসংস্থান দরিদ্র নারী ও বেকার যুবকদের
একসময় হাঁসের মাংস সংগ্রহের পর ফেলে দেওয়া হতো পালক। সেই পরিত্যক্ত পালকই এখন বৈদেশিক বাণিজ্যের পণ্য। জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার তিলকপুরে হাঁসের পালক প্রক্রিয়াজাত করে চীন, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করছেন উদ্যোক্তা আলতাব হোসেন। তাঁর উদ্যোগে কর্মসংস্থান হয়েছে দরিদ্র নারী ও বেকার যুবকদের।
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতি মাসে ২৫ থেকে ৩০ টন হাঁসের পালক সংগ্রহ করে আনা হয় তিলকপুরের ‘সারাবাংলা ডাউন প্রোডাক্ট’ কারখানায়। সেখানে পালক শুকানো, বাছাই ও আধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করার পর রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা হয়। বিদেশে এসব পালক দিয়ে তৈরি হচ্ছে জ্যাকেট, কম্বল, চাদর, বালিশ, জাহাজের সোফা ও ব্যাডমিন্টনের ফেদারের ককসহ বিভিন্ন পণ্য।
আলতাব হোসেন ২০১৪ সালে ছোট পরিসরে হাঁসের পালক নিয়ে কাজ শুরু করেন। তবে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা না থাকায় তখন সফল হননি। পরে বৃত্তি নিয়ে চীনে গিয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। সেখানে পালক প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠানে এক বছর কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ২০২২ সালে চীন থেকে আধুনিক যন্ত্রপাতি এনে জয়পুরহাটের তিলকপুর বাজারে কারখানাটি গড়ে তোলেন। এতে তাঁর প্রায় চার থেকে পাঁচ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। এক বছর পর থেকে ব্যবসায় সাফল্য পেতে শুরু করেন তিনি।
কারখানাটিতে বর্তমানে ১৬ জন শ্রমিক কাজ করছেন। পাশাপাশি পালক সংগ্রহ ও প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে যুক্ত রয়েছেন স্থানীয় নারী শ্রমিকেরা।
শ্রমিক মীম খাতুন জানান, পালক রোদে শুকিয়ে বস্তায় ভরে কারখানায় পাঠান তিনি। এ কাজ থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনার খরচও বহন করেন।
স্বামীহারা সামেনা বেগম বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর আট সদস্যের পরিবার চালাতে তাঁকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। কারখানাটিতে কাজ পাওয়ার পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। মাসে ১০ হাজার টাকা বেতন পান তিনি। অতিরিক্ত সময় কাজ করলে আয় আরও বাড়ে।
কারখানার ব্যবস্থাপক সোহেল রানা জানান, সারাদেশ থেকে সংগ্রহ করা পালক প্রথমে রোদে শুকানো হয়। এরপর কয়েক ধাপে যন্ত্রের সাহায্যে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। ছোট পালক বিভিন্ন শীতবস্ত্র ও অন্যান্য পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। আর পাখার পালক দিয়ে তৈরি হয় ব্যাডমিন্টনের কক।
উদ্যোক্তা আলতাব হোসেন জানান, যেসব দেশে শীত বেশি, সেখানে হাঁসের পালকের চাহিদা রয়েছে। তবে দেশে পালক থেকে তৈরি পণ্য উৎপাদনের পূর্ণাঙ্গ কারখানা গড়ে তুলতে পারলে রপ্তানি আয় আরও বাড়ানো সম্ভব। এ জন্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন। সরকারি সহযোগিতা অথবা স্বল্প সুদে ঋণ পেলে দেশে এসব পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ নিতে চান তিনি।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ট্রেনিং অফিসার কল্পনা রানী রায় জানান, দপ্তরের কর্মকর্তারা কারখানাটি পরিদর্শন করেছেন এবং প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণের বিষয়ে উদ্যোক্তাকে পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি কারিগরি সহযোগিতাও দেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, এ খাতে বিনিয়োগ বাড়লে দেশে পালক থেকে তৈরি বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও সম্ভব হবে।
পরিত্যক্ত একটি উপকরণকে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপ দেওয়ার এ উদ্যোগ স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পেলে হাঁসের পালকভিত্তিক শিল্প দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।