মাগুরায় নতুন সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেন, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং একটি অডিও রেকর্ড ঘিরে আলোচনা চলছে। এ নিয়ে শালিখা উপজেলার আড়পাড়ায় স্থানীয় বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অন্যদিকে, আসন্ন কৃষি মৌসুমে সময়মতো ও ন্যায্য দামে সার পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন কৃষকে ও সচেতন মহল।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাগুরার ৩৬টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার জন্য ৩৭ জন নতুন সার ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এসব পদে আবেদন করেছিলেন ৫৯৬ জন। নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর থেকেই প্রার্থী বাছাইয়ের মানদণ্ড, রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব এবং আবেদনকারীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও রেকর্ডে শ্রীপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বদরুল আলম হিরোকে টাকা দেওয়ার প্রসঙ্গ রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। অডিওতে শোনা বক্তব্যের সত্যতা ও প্রেক্ষাপট নিয়ে শ্রীপুর উপজেলার আমলসার ইউনিয়ন বিএনপির নেতা মোস্তাফিজুর রহমান মঞ্জুর ভাই রঞ্জু আহমেদের বক্তব্য হিসেবে প্রচারিত হয়। তবে ওই অডিওর বিষয়ে তিনি পরে বক্তব্য অস্বীকার করে এটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি বলে দাবি করেছেন।
৫৯৬ জনের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন ?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে কামরুল ইসলাম নামে এক ব্যবসায়ীকে সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে মন্তব্য করতে দেখা যায়। ভিডিওতে তিনি বলেন, মাগুরায় যাঁরা সার ডিলারশিপ পেয়েছেন, তাঁরা সবাই বিএনপির ত্যাগী নেতা। এমনটা জেনে তিনি খুশি হয়েছেন। এরপরই তিনি প্রশ্ন তোলেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতারা যদি এসব ত্যাগী নেতাকে চিনতেন, তাহলে ৫৯৬ জন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে জনপ্রতি দুই হাজার টাকা করে কেন নেওয়া হলো?
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আবেদনকারীদের কাছ থেকে জনপ্রতি দুই হাজার টাকা নেওয়া হয়ে থাকলে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১১ লাখ ৯২ হাজার টাকা। তিনি জানতে চান, প্রকৃত ব্যবসায়ীরা কেন বাদ পড়েছেন এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে কী মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট করারও দাবি জানান তিনি।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মন্তব্যের ঘরে অনেকে নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
বালিদিয়ায় নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন
মহম্মদপুর উপজেলার বালিদিয়া ইউনিয়নে ‘বিসমিল্লাহ ট্রেডার্স’-এর নামে সার ডিলারশিপ পাওয়া নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি নেতার অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী নাইমা ইসলামের স্বামী মো. মফিদুল ইসলাম সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন। এ পরিচয়ের কারণে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
তবে কারও অতীত রাজনৈতিক পরিচয় বা পারিবারিক সম্পর্ক একাই নিয়োগে অনিয়মের প্রমাণ নয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আবেদনপত্র, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, ট্রেড লাইসেন্স, আর্থিক সক্ষমতা এবং নির্ধারিত যোগ্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
সার ডিলার নিয়োগে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মাগুরা পৌর যুবদলের সভাপতি মিজানুর রহমান মিজান। মহম্মদপুর উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি শরিফুজ্জামান টুকুও বালিদিয়া ইউনিয়নের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে, পৌরসভার ডিলার নিয়োগে নিজের পরিবারের একজনের আবেদন মূল্যায়িত না হওয়ার অভিযোগ তুলে প্রার্থী বাছাইয়ের মানদণ্ড জানতে চেয়েছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফারুকুজ্জামান ফারুক।
এসব বক্তব্যে নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে অসন্তোষের চিত্র উঠে এসেছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি ও বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
ফেসবুক পোস্ট ঘিরে শালিখায় সংঘর্ষ
সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে শালিখা উপজেলা সদর আড়পাড়ায় স্থানীয় বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কৃষকদলের নেতা আলামিন মোল্লা ওরফে সোহাগের ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এতে রানা, আলিম ও রসুল নামে তিনজন আহত হন।
শালিখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আশিকুর রহমান জানিয়েছেন, পুলিশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেছে। তবে সংঘর্ষের ঘটনায় কার কী ভূমিকা ছিল, তা নির্ধারণে তদন্তের তথ্য প্রয়োজন।
প্রশাসনের বক্তব্য ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
মাগুরার জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদের ভাষ্য অনুযায়ী, ৫৯৬ জন আবেদনকারীর মধ্য থেকে নীতিমালা অনুসারে যাচাই-বাছাই করে প্রার্থীদের তালিকা সুপারিশ করা হয়েছিল। শালিখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর হাসান চৌধুরী স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, এটি প্রাথমিক তালিকা; তালিকায় বিতর্কিত কেউ থাকলে যাচাই-বাছাই করে বাদ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. মনোয়ার হোসেন খানও নিয়োগের তালিকা তৈরিতে জেলা প্রশাসন ও কৃষি কর্মকর্তাদের যাচাই-বাছাইয়ের কথা বলেছেন।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক আলী আহম্মেদ জানিয়েছেন, তালিকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তির নাম থাকায় বিতর্ক তৈরি হয়েছে এবং দলের কিছু নেতাকর্মীর মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তবে তিনি অর্থ লেনদেন, স্বজনপ্রীতি ও দলীয় প্রভাবের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এ অবস্থায় অভিযোগকারী, নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যের পাশাপাশি নিয়োগের মূল্যায়নপত্র ও আবেদন যাচাইয়ের নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে কথিত অডিও রেকর্ডের সত্যতা যাচাই এবং আবেদনকারীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের হিসাব প্রকাশ করা হলে বিতর্ক নিরসনে সহায়ক হতে পারে।
‘দলীয়করণ হলে কৃষকের সার পাওয়া কঠিন হবে’
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের মাগুরা জেলা আহ্বায়ক ও গণ কমিটির সদস্যসচিব ইঞ্জিনিয়ার শম্পা বসু বলেন, কৃষকদের জন্য চাষাবাদে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো ন্যায্য দামে সঠিক সময়ে সার পাওয়া। ডিলার নিয়োগে দলীয়করণ ও দুর্নীতির প্রভাব পড়লে কৃষকের সারপ্রাপ্তি কঠিন হয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, অতীতেও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে সার বিক্রির ঘটনা দেখা গেছে। কখনো কখনো কৃষকেরা সময়মতো সার পাননি, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের ওপর। কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব পুরো দেশের ওপর পড়ে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি
সার ডিলার নিয়োগ কেবল ব্যবসায়িক সুযোগের বিষয় নয়; এর সঙ্গে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়, ফসলের ফলন এবং কৃষি উপকরণের সুষ্ঠু বণ্টন জড়িত। ফলে নিয়োগে অনিয়ম হয়ে থাকলে তা শুধু আবেদনকারীদের বঞ্চিত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, সার বিতরণব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণে নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগ্যতা, প্রার্থী বাছাইয়ের মানদণ্ড, আবেদনকারীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের হিসাব এবং অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের পদক্ষেপ স্পষ্ট করা জরুরি। একই সঙ্গে কথিত অডিওর সত্যতা যাচাই, অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
মাগুরায় সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের অবসানে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষ যাচাই ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। যাতে প্রকৃত যোগ্য ব্যবসায়ীরা ন্যায্য সুযোগ পান এবং আসন্ন কৃষি মৌসুমে কৃষকেরা সময়মতো সার সংগ্রহ করতে পারেন।