এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে-বাংলাদেশে কি শুধু বিদ্যমান সড়ক পরিবহন আইন যথেষ্ট,নাকি প্রয়োজন একটি পৃথক ও সমন্বিত 'সড়ক নিরাপত্তা আইন'?
প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে,সড়ক পরিবহন নিয়ন্ত্রণ এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। বিদ্যমান আইনে চালকের লাইসেন্স,যানবাহনের নিবন্ধন ও ফিটনেস,বিভিন্ন অপরাধ এবং শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু সড়ক নিরাপত্তার পরিধি এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত। এর সঙ্গে যুক্ত সড়কের নকশা ও মান,নিরাপদ গতি,পথচারীর অধিকার,গণপরিবহনের পরিচালনা,চালকের কর্মঘণ্টা ও বিশ্রাম, যানবাহনের নিরাপত্তা মান,দুর্ঘটনার তথ্য,জরুরি চিকিৎসা এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের বৈশ্বিক সড়ক নিরাপত্তা প্রতিবেদনের বাংলাদেশভিত্তিক তথ্যে ২০২১ সালে সরকারি হিসাবে ৫ হাজার ৮৪ জন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার তথ্য রয়েছে।একই বছরে WHO-এর হিসাব ৩১ হাজার ৫৭৮ মৃত্যু। এই ব্যবধান আমাদের শুধু দুর্ঘটনার ভয়াবহতার কথাই বলে না; বরং তথ্য সংগ্রহ, ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের সীমাবদ্ধতার কথাও সামনে আনে।
অন্যদিকে WHO-এর ২০২৩ সালের বৈশ্বিক প্রতিবেদনে Safe System বা নিরাপদ ব্যবস্থা পদ্ধতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই দর্শনের মূল কথা হলো-মানুষ ভুল করবে,কিন্তু সেই ভুল যেন অনিবার্যভাবে মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতে পরিণত না হয়। এজন্য নিরাপদ সড়ক ও সড়কপাশ,নিরাপদ গতি,নিরাপদ যানবাহন এবং নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী-সবগুলোকে একই ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
সুতরাং বাংলাদেশে যদি নতুন কোনো আইন করা হয়,সেটি যেন আরেকটি শাস্তিমূলক আইন না হয়ে 'সড়ক নিরাপত্তার জন্য একটি সমন্বিত দায়বদ্ধতার আইন' হয়।
সেই আইনে রাষ্ট্রের দায়ও নির্ধারিত হতে হবে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলেই শুধু চালককে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলে Safe System বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। কারণ চালক ভুল করতে পারেন,পথচারী অসতর্ক হতে পারেন কিংবা কোনো যানবাহন যান্ত্রিক ত্রুটিতে পড়তে পারে। কিন্তু নিরাপদ ব্যবস্থা এমন হতে হবে,যাতে একটি মানবিক ভুলের পরিণতি মৃত্যু না হয়।
তাই প্রস্তাবিত সড়ক নিরাপত্তা আইনে শুধু চালকের অপরাধ ও শাস্তি নয়,'ব্যবস্থাগত ব্যর্থতার দায়ও নির্ধারণ করা প্রয়োজন।' যেমন-সড়ক নির্মাণের আগে নিরাপত্তা নিরীক্ষা হয়েছিল কি না; নির্মিত সড়কে উচ্চঝুঁকির স্থান শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না; নির্ধারিত গতিসীমা বাস্তবে কার্যকর ছিল কি না;
পথচারী ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারীর জন্য নিরাপদ ব্যবস্থা ছিল কি না; গণপরিবহনের চালকের কর্মঘণ্টা ও বিশ্রাম যথাযথ ছিল কি না; যানবাহনের ফিটনেস বাস্তবভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না;
দুর্ঘটনার ঝুঁকি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আগে অবহিত ছিল কি না; এবং দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিকে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল কি না।
অর্থাৎ আইনের দর্শন হওয়া উচিত-'দুর্ঘটনার পর দায় নির্ধারণের পাশাপাশি দুর্ঘটনার আগেই ঝুঁকি প্রতিরোধের বাধ্যবাধকতা।'
জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ ও তথ্যভান্ডার এ ধরনের আইন হলে এর অধীনে একটি শক্তিশালী জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাঠামো প্রয়োজন। বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ দায়িত্বে কাজ করে; কিন্তু সড়ক নিরাপত্তার প্রকৃতি এমন যে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
বাংলাদেশের জাতীয় স্থল পরিবহন নীতিতেও জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা সেল শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে।
তাই নতুন আইনের মাধ্যমে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল বা অকার্যকর না করে তাদের দায়িত্বের মধ্যে সুস্পষ্ট সমন্বয়,তথ্য আদান-প্রদান,জবাবদিহি এবং ফলাফল পরিমাপের ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে প্রয়োজন একটি 'একক জাতীয় সড়ক দুর্ঘটনা তথ্যভান্ডার'। পুলিশ,বিআরটিএ,হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস,সড়ক ও জনপথ,স্থানীয় সরকার এবং নগর পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্য একই কাঠামোর মধ্যে এলে দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র বোঝা সহজ হবে। কোন সড়ক,কোন মোড়,কোন সময়,কোন ধরনের যান এবং কোন ঝুঁকির কারণে দুর্ঘটনা বেশি হচ্ছে-তথ্য তখন নীতিনির্ধারণের সরাসরি ভিত্তি হতে পারবে।
সড়ক নিরাপত্তা আইন হবে প্রতিরোধের আইন
এই আইনটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত-এটি যেন শুধু দুর্ঘটনার পর শাস্তি দেওয়ার আইন না হয়; বরং 'দুর্ঘটনা প্রতিরোধের আইন' হয়।
নতুন সড়ক নির্মাণের আগে নিরাপত্তা নিরীক্ষা,বিদ্যমান ঝুঁকিপূর্ণ সড়কের নিয়মিত পর্যালোচনা,বৈজ্ঞানিক গতিসীমা নির্ধারণ,পথচারীবান্ধব অবকাঠামো,নিরাপদ গণপরিবহন,যানবাহনের নিরাপত্তা মান,চালকের প্রশিক্ষণ ও কর্মঘণ্টা,দুর্ঘটনার পর জরুরি চিকিৎসা-সবকিছুর জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে।
বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি বাস যদি নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে যাত্রী ওঠানামা করায়,চালক যদি দীর্ঘ সময় বিরতিহীনভাবে গাড়ি চালান,পথচারী যদি নিরাপদ পারাপারের সুযোগ না পান,অথবা একটি বিপজ্জনক মোড় বছরের পর বছর একইভাবে পড়ে থাকে-এসবকে শুধু বিচ্ছিন্ন অনিয়ম হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলো 'ব্যবস্থাগত সড়ক নিরাপত্তা ব্যর্থতা' হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ থাকতে হবে।
আইন থাকবে,কিন্তু আইন প্রয়োগের নিশ্চয়তাও থাকতে হবে
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার-নতুন আইন করলেই সড়ক নিরাপদ হয়ে যাবে না। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে বিভিন্ন আইন,বিধিমালা,নীতিমালা ও কৌশলগত পরিকল্পনা রয়েছে। সমস্যা অনেক ক্ষেত্রে আইনের অনুপস্থিতির চেয়ে বাস্তবায়নের দুর্বলতা। তাই নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইনের সঙ্গে পর্যাপ্ত অর্থায়ন,দক্ষ জনবল,প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি,স্বচ্ছ তথ্যব্যবস্থা এবং স্বাধীন জবাবদিহির ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
আইনের সাফল্য পরিমাপ হবে কতটি মামলা হলো বা কতজনকে জরিমানা করা হলো-তা দিয়ে নয়। বরং 'কতটি মৃত্যু প্রতিরোধ করা গেল,কতটি উচ্চঝুঁকির স্থান নিরাপদ করা হলো,কতজন চালকের কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রিত হলো,কতটি অনিরাপদ যানবাহন ব্যবস্থা থেকে সরানো হলো এবং আহত মানুষের কত দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত হলো-তার ভিত্তিতে।'
WHO-এর বর্তমান Safe System দর্শনও মূলত এই জায়গাতেই গুরুত্ব দেয়-মানবিক ভুলকে স্বীকার করে এমন একটি পরিবহনব্যবস্থা তৈরি করা,যা মানুষের জীবনকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য নকশা করা।
অতএব বাংলাদেশের জন্য 'সড়ক নিরাপত্তা আইন' কোনো নতুন শাস্তির কাঠামো তৈরির উদ্যোগ না হয়ে হতে পারে একটি নতুন রাষ্ট্রীয় দর্শনের আইন-যেখানে চালক যেমন দায়বদ্ধ,তেমনি সড়ক নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান,যানবাহন মালিক,নিয়ন্ত্রক সংস্থা,পরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং রাষ্ট্রও নিজ নিজ দায়িত্বের জন্য জবাবদিহির আওতায় থাকবে।
কারণ নিরাপদ সড়ক শুধু চালকের দায়িত্ব নয়। 'নিরাপদ সড়ক একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।' আর সেই দায়িত্বকে আইনি কাঠামোর মধ্যে স্পষ্ট,পরিমাপযোগ্য ও জবাবদিহিমূলক করে তোলাই হতে পারে একটি আধুনিক 'সড়ক নিরাপত্তা আইনের সবচেয়ে বড় যৌক্তিকতা।'
লেখক: কলামিস্ট,সোস্যাল এক্টিভিস্ট,সাবেক মহাসচিব-নিরাপদ সড়ক চাই