গাজীপুরের টঙ্গীতে সাত বছর বয়সী এক মাদ্রাসাছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার মাদ্রাসাশিক্ষক মোসলেম উদ্দিনের জামিন আবেদন রোববার (২৫ অক্টোবর) নামঞ্জুর করেছেন আদালত। অন্যদিকে, মাদ্রাসায় হামলা, ভাঙচুর, শিক্ষক-কর্মচারীদের মারধর এবং ১৭ লাখ টাকা ও পাঁচটি মুঠোফোন লুটের অভিযোগে শিশুটির বাবা ও অন্যদের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করেছে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ।
পুলিশ জানিয়েছে, শিশুটির জবানবন্দি আদালতে রেকর্ড করা হয়েছে। শনিবার (২৪ অক্টোবর) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়। ঘটনার সময় উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান। তবে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
রোববার শিক্ষক মোসলেম উদ্দিনের জামিন আবেদন নামঞ্জুর হওয়ার তথ্য আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে শিশুটির বাবার করা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলাটি তদন্তাধীন।
যেভাবে সামনে আসে অভিযোগ
পরিবারের অভিযোগ, গত ১৯ অক্টোবর টঙ্গীর আউচপাড়া এলাকার একটি মাদ্রাসায় প্রথম শ্রেণির ওই শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়ন করা হয়। ঘটনার পর শিশুটি মাদ্রাসায় যেতে অনীহা প্রকাশ করে। পরিবারের সদস্যরা কারণ জানতে চাইলে একপর্যায়ে সে তাদের কাছে ঘটনার কথা জানায়।
এরপর ২১ অক্টোবর শিশুটির স্বজনেরা মাদ্রাসায় গিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এ সময় বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয় লোকজনও সেখানে জড়ো হন। শিক্ষককে মারধরের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।
পরে শিশুটির বাবা বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। ওই মামলায় শিক্ষককে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হলে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ২২ অক্টোবর শিশুটি গাজীপুর মহানগর হাকিম আদালতে বিচারকের কাছে ঘটনার বর্ণনা দেয়। বিচারক তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। ২৪ অক্টোবর মাদ্রাসা পরিদর্শন করে তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেন।
মাদ্রাসায় ১৭ লাখ টাকা কোথা থেকে এলো?
ঘটনার পর মাদ্রাসার কার্যালয়ে ১৭ লাখ টাকা থাকার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষের অভিযোগ, শিশুটির বাবার নেতৃত্বে ১৫ থেকে ১৬ জনের একটি দল মাদ্রাসায় প্রবেশ করে শিক্ষককে মারধর করে। তাঁকে রক্ষা করতে গিয়ে অন্য শিক্ষক-শিক্ষিকা ও নিরাপত্তাকর্মীরাও হামলার শিকার হন। এ সময় কার্যালয় ভাঙচুর করে নগদ ১৭ লাখ টাকা ও পাঁচটি মুঠোফোন নিয়ে যাওয়া হয় বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ।
তবে এই অর্থের উৎস কী, কার মালিকানাধীন ছিল, কোন উদ্দেশ্যে মাদ্রাসার কার্যালয়ে রাখা হয়েছিল এবং অর্থটির পক্ষে কোনো হিসাব বা নথি রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
আইনগতভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে ১৭ লাখ টাকা নগদ রাখা নিজে থেকেই অবৈধ নয়। তবে অর্থের বৈধ উৎস, মালিকানা, প্রতিষ্ঠানের হিসাবপত্র এবং প্রযোজ্য কর-সংক্রান্ত বিধি মেনে চলার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। অর্থটি জমি বিক্রির টাকা হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট দলিল, বিক্রয়মূল্য গ্রহণের প্রমাণ এবং হিসাবের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য যাচাই করা যেতে পারে।
এ কারণে শুধু নগদ অর্থ থাকার তথ্য থেকে অর্থটি অবৈধ বা বৈধ কোনোটিই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। একইভাবে, ১৭ লাখ টাকা লুটের অভিযোগও তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার আগে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
বাবার দাবি, মেয়ের বিচার চাইতে গিয়েছিলেন
শিশুটির বাবা নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ২৩ অক্টোবর দিবাগত রাতে সংবাদমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি দাবি করেন, মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার চাইতেই মাদ্রাসায় গিয়েছিলেন; কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না।
মাদ্রাসায় ভাঙচুর এবং ১৭ লাখ টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন। নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, মেয়ের ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে শিক্ষককে মারধর, কার্যালয় ভাঙচুর এবং অর্থ ও মুঠোফোন লুটের ঘটনায় পৃথক মামলা হয়েছে। দুই পক্ষের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তদন্ত প্রয়োজন।
তদন্তে যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে আসছে
ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানতে তদন্তে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—
- মাদ্রাসার সিসিটিভি ফুটেজে ঘটনার আগে ও পরের দৃশ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতি যাচাই।
- অভিযোগের সময় শিশুটি কোথায় ছিল এবং সেখানে কারা উপস্থিত ছিলেন, তা সাক্ষ্য ও অন্যান্য আলামতের মাধ্যমে পরীক্ষা।
- মাদ্রাসার কার্যালয়ে ১৭ লাখ টাকা থাকার দাবির পক্ষে হিসাবপত্র, অর্থের উৎস ও মালিকানার নথি যাচাই।
- কথিত লুটের অর্থের পরিমাণ, মুঠোফোনের মালিকানা এবং সেগুলো সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পরীক্ষা।
- দুই পক্ষের অভিযোগ ও পাল্টা মামলার তথ্য-প্রমাণ নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা।