ভোরের আলো ফুটতেই কুয়াশার চাদর সরিয়ে জেগে ওঠে চলনবিল। বিস্তীর্ণ জলরাশির ওপর দিয়ে উড়ে যায় পাখির ঝাঁক। কোথাও সাদাবকের সারি, কোথাও বালিহাঁসের জলকেলি, আবার কোথাও পানকৌড়ির ডুবসাঁতার। ডাহুকের ডাক আর পাখিদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনাজুড়ে বিস্তৃত এই জলাভূমি। পাখিদের এই বিচরণ যেন জানান দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। সকালের সোনালি রোদে অগভীর পানিতে খাবারের সন্ধানে ব্যস্ত পাখিরা। কেউ মাছ শিকারে ডুব দিচ্ছে, কেউ ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে দূর দিগন্তে। আবার কোনো পাখিকে দেখা যাচ্ছে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। প্রকৃতির এমন দৃশ্য মুগ্ধ করছে প্রকৃতিপ্রেমী ও পথচারীদের। বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক জলাভূমি চলনবিল মাছ ও কৃষিসম্পদের জন্য পরিচিত। বর্ষায় পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠা এই বিলের বিভিন্ন অংশে শীতের শুরুতে পানি কমতে থাকে। তখন পাখিদের খাবার সংগ্রহের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়। এ সময় নাটোর-বগুড়া মহাসড়কের দুই পাশে এবং সিংড়া-বারুহাস-তাড়াশ সড়কের আশপাশের জলাভূমিতে দেখা মিলছে নানা প্রজাতির পাখির।
সাদাবক, পানকৌড়ি, শামুকখোল ও বালিহাঁসের পাশাপাশি বিচরণ করছে বিভিন্ন জলচর পাখি। তবে চলনবিলে দেখা যাওয়া সব পাখিই পরিযায়ী নয়। কিছু প্রজাতির পাখি সারা বছরই এ অঞ্চলে বসবাস করে। স্থানীয় ও পরিযায়ী উভয় ধরনের পাখির উপস্থিতি বিলের জীববৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করছে। শীতের মৌসুমে খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখি দেশের জলাভূমিগুলোতে আসে। চলনবিলও তাদের অন্যতম বিচরণক্ষেত্র। পাখির এই আনাগোনা জলাভূমির সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি এর প্রাকৃতিক পরিবেশের গুরুত্বও তুলে ধরে। পাখিদের অবাধ বিচরণে চলনবিল প্রাণবন্ত হয়ে উঠলেও তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কিছু অসাধু শিকারির ফাঁদে পড়ে প্রাণ হারাচ্ছে পাখি। খাবারের প্রলোভন দেখিয়ে কিংবা বিভিন্ন কৌশলে পাখি শিকার জলাভূমির জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সভাপতি ও বিলহালতী ত্রিমোহনী কলেজের সহকারী অধ্যাপক আখতারুজ্জামান জানান, প্রতিবছর শীত মৌসুমে খাবারের সন্ধানে বক, বালিহাঁস, পানকৌড়ি, শামুকখোলসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি চলনবিলে আসে। তাদের বিচরণে বিলের প্রকৃতি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। তবে পাখিদের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। তিনি জানান, ২০১২ সাল থেকে চলনবিলের দুর্গম এলাকায় পাখি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কাজ করছেন তাঁরা। পাখি শিকারের খবর প্রশাসনকে জানানো, স্থানীয় মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি এবং বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে পাখি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। চলনবিলকে শুধু মানুষের জীবিকার ক্ষেত্র নয়, পাখিসহ নানা প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবেও টিকিয়ে রাখাই তাঁদের লক্ষ্য।
সিংড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল রিফাত বলেন, চলনবিল জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি। শীত মৌসুমে এখানে অসংখ্য পাখির আগমন ঘটে। তিনি জানান, পাখি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সদস্যরা ভোর থেকেই বিভিন্ন এলাকায় কাজ করেন। তাঁদের সহযোগিতায় ইতোমধ্যে কয়েকজন পাখি শিকারির বিরুদ্ধে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ পাখিদের নিরাপদে বিচরণের পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পাখির বৈচিত্র্যের কারণে চলনবিলে পর্যটনের সম্ভাবনা রয়েছে। শীতের সকালে পাখি দেখা, জলাভূমির সৌন্দর্য উপভোগ এবং প্রকৃতির ছবি তুলতে এখানে আসতে পারেন ভ্রমণপিপাসুরা।
নাটোর-৩ (সিংড়া) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম আনু জানান, চলনবিলকে পর্যটনশিল্প হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ চলছে। বিলের পাখি ও পরিবেশ রক্ষায় চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তবে পর্যটনের বিকাশ ঘটাতে গিয়ে জলাভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। অপরিকল্পিত স্থাপনা, অতিরিক্ত শব্দ, প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য এবং পাখিদের বিরক্ত করে ছবি তোলার প্রবণতা তাদের আবাসস্থলের ক্ষতি করতে পারে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পরিকল্পিত পর্যটনব্যবস্থা, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পাখির নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং শিকারবিরোধী নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে প্রকৃতি ও পর্যটনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব। এতে পর্যটনের সম্ভাবনা বাড়ার পাশাপাশি চলনবিলের পরিবেশও সুরক্ষিত থাকবে।
পাখিরা জলাভূমির খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই তাদের আবাসস্থল সংরক্ষণ শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য রক্ষার বিষয় নয়, পরিবেশের সুস্থতা বজায় রাখারও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।চলনবিলের পাখিদের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে অবৈধ শিকার বন্ধ, জলাভূমি সংরক্ষণ এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। এ কাজে প্রশাসন, পরিবেশকর্মী, স্থানীয় বাসিন্দা, জেলে, কৃষক ও পর্যটকদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শীতের সকালে চলনবিলের আকাশে যখন পাখির ঝাঁক ডানা মেলে, তখন প্রকৃতি যেন মনে করিয়ে দেয় জলাভূমি শুধু মানুষের সম্পদ নয়, অসংখ্য প্রাণের বেঁচে থাকার আধার। সেই আধারকে সুরক্ষিত রাখা গেলে বেঁচে থাকবে পাখি, সমৃদ্ধ হবে জীববৈচিত্র্য, আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অক্ষুণ্ন থাকবে চলনবিলের অনন্য সৌন্দর্য।