বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া, গেট ও আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে পড়ায় শেরপুর-ময়মনসিংহ অঞ্চলে আটকা পড়েছে ১৩০ থেকে ১৩৫টি বন্য হাতি। দীর্ঘদিন ধরে গারো পাহাড়ের বনাঞ্চল দিয়ে দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত করা হাতিগুলো এখন বেশির ভাগ সময় বাংলাদেশ অংশে অবস্থান করছে। এতে খাবারের সংকট বাড়ার পাশাপাশি লোকালয়ে হাতির প্রবেশ ও মানুষ-হাতির সংঘাতও বাড়ছে। বন বিভাগ ও বন্যপ্রাণী গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, জামালপুরের বকশিগঞ্জ থেকে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় হাতি চলাচলের জন্য আগে ৪৪টি গেট ও ১১টি নদী বা ছড়াপথ ছিল। এসব পথ ব্যবহার করে হাতির দল দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত করত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের মেঘালয় অংশে বিভিন্ন চলাচলপথে কাঁটাতারের বেড়া ও গেট স্থাপন এবং কিছু এলাকায় কাজুবাদামের চাষ সম্প্রসারণের কারণে হাতির চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
নালিতাবাড়ী বন বিভাগের মধুটিলা রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল করিমের ভাষ্য, হাতির পরিচিত চলাচলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রাণীগুলো বাংলাদেশ অংশে থেকে যাচ্ছে। ভারতের কিছু এলাকায় খাবারের সংকটও তাদের চলাচলে প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার (আইইউসিএন) প্রোগ্রাম ম্যানেজার সারোয়ার আলম দীপু জানান, আগে হাতিগুলো বছরের বেশির ভাগ সময় ভারতের অংশে থাকত এবং বছরে অন্তত দুবার বাংলাদেশে আসত। এখন সারা বছরই শেরপুর-ময়মনসিংহ অঞ্চলে তাদের দেখা যাচ্ছে।
এক দশকে হাতির সংখ্যা বেড়েছে
আইইউসিএনের ২০১৬ সালের গবেষণায় শেরপুর-ময়মনসিংহ অঞ্চলে প্রায় ৫১টি হাতি স্থায়ীভাবে বাংলাদেশ অংশে থাকার তথ্য পাওয়া যায়। সংস্থাটির বর্তমান ধারণা অনুযায়ী, এ সংখ্যা বেড়ে ১৩০ থেকে ১৩৫টিতে দাঁড়িয়েছে। হাতির সংখ্যা বাড়লেও তাদের বিচরণক্ষেত্র ও খাবারের প্রাপ্যতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। একটি এশীয় বন্য হাতির প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ কেজি খাবার এবং বিপুল পরিমাণ পানির প্রয়োজন হয়। শুষ্ক মৌসুমে বনের খাবার কমে গেলে হাতির দল ফসলি জমি ও লোকালয়ে প্রবেশ করে।
খাবারের সংকটে লোকালয়ে হাতি
শেরপুরের নালিতাবাড়ীর পানিহাটা সীমান্ত এলাকায় খাবারের সন্ধানে অন্তত ২২টি হাতির একটি দলকে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা গেছে। বনের ভেতরে খাবারের সংকটের চিত্রও উঠে এসেছে গাছের বাকল খেয়ে বেঁচে থাকার দৃশ্যে। এদিকে হাতির আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ায় বনাঞ্চলের আশপাশে মানুষের বসতি ও কৃষিজমির সঙ্গে তাদের সংঘাত বাড়ছে। ফসল রক্ষায় অনেক কৃষক জমির চারপাশে বৈদ্যুতিক তারের বেড়া বসাচ্ছেন। কোথাও কোথাও এসব বেড়ায় অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। হাতি তাড়াতে পটকা, মশাল ও ধারালো অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনাও ঘটছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত এক যুগে শেরপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে অন্তত ৩৫টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, গুলিবিদ্ধ হওয়া এবং ধারালো অস্ত্রের আঘাত এসব মৃত্যুর কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে। শেরপুরের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা সুমন সরকার জানান, মানুষ ও হাতির মধ্যে সংঘাত কমাতে স্থানীয়দের নিয়ে এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে। সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রমও চলছে। তবে এসব উদ্যোগের পরও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
সমাধানে কূটনৈতিক উদ্যোগের অপেক্ষা
সীমান্তের দুই পাশে বিচরণকারী হাতিগুলোর চলাচল স্বাভাবিক করতে বাংলাদেশ ভারতকে উদ্বেগের কথা জানিয়েছে বলে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলামের ভাষ্য, হাতির চলাচলের পথ খুলে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা ভারতকে জানানো হয়েছে। ভারতের উদ্যোগ ছাড়া এ সংকটের স্থায়ী সমাধান কঠিন বলে মনে করছেন তিনি। এ বিষয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বন বিভাগের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। বন্যপ্রাণী গবেষকদের মতে, হাতির ঐতিহ্যগত চলাচলপথ পুনরুদ্ধার, বনাঞ্চল সংরক্ষণ এবং সীমান্তের দুই দেশের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সংকট মোকাবিলা কঠিন হবে। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে হাতি ও মানুষের মধ্যে সংঘাত আরও বাড়তে পারে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা