মাগুরা পৌর যুবদলের নেতা শাকের হোসেন হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। ১৫০ ভরি সোনা ডাকাতির একটি ঘটনার সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র খুঁজছে পুলিশ। এ ঘটনায় এক নারী, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলেরনেতা, একজন স্বর্ণ ব্যবসায়ীসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডাকাতি হওয়া সোনার পাঁচটি বার উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে পুলিশ। তবে সোনা ডাকাতি ও শাকের হত্যার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি তদন্তকারী সংস্থা।
অন্যদিকে, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, লুট করা সোনা ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের জেরেই শাকেরকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। এসব তথ্য তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হলেও আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এগুলোকে অভিযোগ ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
বাস কাউন্টারে গুলিতে নিহত শাকের
গত ২১ অক্টোবর ভোরে মাগুরা পৌরসভার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে রয়েল পরিবহনের কাউন্টারে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন শাকের হোসেন (৩৯)। তিনি মাগুরা পৌর যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ওই কাউন্টারে মাস্টার হিসেবে কাজ করতেন।
ঘটনার দিন ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে কাউন্টারে তাঁকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। প্রথমে অসুস্থতাজনিত কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করে পরিবারের সদস্যরা মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যান। পরে গোসলের প্রস্তুতির সময় মাথার পেছনে ক্ষতচিহ্ন দেখতে পেয়ে তাঁদের সন্দেহ হয়। খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহের সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করে। ময়নাতদন্তের সময় শাকেরের মাথার খুলির ভেতর থেকে একটি বুলেট উদ্ধার করা হয়। চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা, গুলির আঘাতেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এ তথ্য প্রকাশের পর ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড হিসেবে সামনে আসে। শাকেরের স্ত্রী শারমিন আক্তার বাদী হয়ে মাগুরা সদর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা ও অস্ত্র আইনে মামলা করেন।
প্রথম দফায় গ্রেপ্তার রনি ও শামীমা
হত্যাকাণ্ডের পরদিন রাতে রনি শিকদার (৩৮) ও শামীমা তাবাসসুম (৩১) নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। রনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। তাঁকে শাকেরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। পুলিশের আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে বলা হয়, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁদের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে পাওয়া তথ্য ও সাক্ষ্যপ্রমাণ যাচাই করে আরও তদন্ত প্রয়োজন। হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন, অন্য জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং অপরাধে ব্যবহৃত অস্ত্র ও যানবাহন উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। গ্রেপ্তারের পর তাঁদের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয় বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তবে রনি শিকদারের পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। তাঁর বড় ভাই রাজীব শিকদার দাবি করেন, শাকেরের সঙ্গে রনির দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তাঁর অভিযোগ, বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই রনিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অবশ্য এ বক্তব্যও সংশ্লিষ্ট পরিবারের দাবি; তদন্তের মাধ্যমে এর সত্যতা যাচাই হওয়া প্রয়োজন।
তদন্তে সামনে আসে ১৫০ ভরি সোনা ডাকাতির ঘটনা
শাকের হত্যার তদন্তের মধ্যেই মাগুরায় সোনা ডাকাতির একটি ঘটনা সামনে আসে। মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ৬ অক্টোবর দুপুরে মাগুরা সদর উপজেলার রামনগর বাজার এলাকায় নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিয়ে একটি দল বাস থামিয়ে এক সোনা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১৫০ ভরি সোনা ও নগদ ৬০ হাজার টাকা লুট করে। মামলার বাদী মো. মজিবর রহমান মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার বাসিন্দা। তাঁর অভিযোগ, ঢাকার তাঁতীবাজারের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সোনা সংগ্রহ করে তিনি ঝিনাইদহের ব্যবসায়ী অনিমেষ মজুমদারের কাছে পৌঁছে দিতে গোল্ডেন লাইন পরিবহনের বাসে ঢাকা থেকে রওনা হয়েছিলেন। বাসটি মাগুরা সদরের রামনগর বাজার এলাকায় পৌঁছালে ১২ থেকে ১৫ জনের একটি দল নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিয়ে সেটি থামায়। পরে মজিবর রহমানকে জোর করে বাস থেকে নামিয়ে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর অভিযোগ, সোনা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে তাঁর কাছ থেকে ১৫০ ভরি তেজাবি সোনার দণ্ড ও নগদ ৬০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। মামলায় লুট হওয়া সোনার মূল্য প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।
মজিবর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর তিনি চিকিৎসা নেন এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে মাগুরা ছেড়ে চলে যান। পরে ১৫ অক্টোবর থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। ২৮ অক্টোবর রাতে এ ঘটনায় মামলা হয়।
স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মারুফ গ্রেপ্তার, সোনা উদ্ধার
সোনা ডাকাতির মামলায় প্রথমে ঝিনাইদহের ব্যবসায়ী অনিমেষ মজুমদারকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি ঝিনাইদহ শহরের গীতাঞ্জলি সড়কের গিনি হাউস নামের একটি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের মালিক। এরপর মাগুরা পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মো. মারুফ হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, মারুফের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পারনান্দুয়ালী এলাকার একটি বাড়ি থেকে ডাকাতি হওয়া সোনার পাঁচটি বার জব্দ করা হয়েছে। তাঁকে আদালতে হাজির করার পর সোনা ডাকাতির মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। এ ছাড়া সোনা ডাকাতির মামলায় মো. জুয়েল হোসেন, তৌকির আহমেদ ও মারুফের শ্বশুর ফরিদ মণ্ডলকে গ্রেপ্তারের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। এ মামলায় মোট পাঁচজন গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সোনা ডাকাতির মামলায় গ্রেপ্তার এবং শাকের হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারের তালিকা এক নয়। দুই মামলার আসামিদের ভূমিকা ও পারস্পরিক সম্পর্ক তদন্তের মাধ্যমে আলাদাভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
সোনা ভাগাভাগির বিরোধে হত্যার অভিযোগ
প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা থেকে ভারতীয় সীমান্তের উদ্দেশে পাঠানো একটি সোনার চালান লুট এবং পরে তা ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের সূত্র ধরে শাকের হত্যার ঘটনা ঘটতে পারে। এসব প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে, শাকের সোনার চালান সম্পর্কে তথ্য পেয়েছিলেন এবং চালান লুটের ঘটনায় কয়েকজনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। পরে লুট করা সোনা ভাগাভাগি নিয়ে তাঁর সঙ্গে অন্যদের বিরোধ তৈরি হয়। প্রতিবেদনগুলোতে আরও দাবি করা হয়েছে, শাকেরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত শামীমা তাবাসসুমের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের সূত্র ধরে সোনার চালান লুটের বিষয়টি তদন্তে সামনে আসে। মারুফ হোসেন গ্রেপ্তারের পর হত্যাকাণ্ড ও সোনা-সংক্রান্ত বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলেও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব দাবির বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। মাগুরা পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন বলেছেন, তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে বিস্তারিত মন্তব্য করা হচ্ছে না। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সোনার পাঁচটি টুকরা জব্দ করা হয়েছে এবং ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে।
সুষ্ঠু তদন্তই এখন সবচেয়ে জরুরি
শাকের হোসেন হত্যাকাণ্ড শুরুতে একটি বাস কাউন্টারে একজন রাজনৈতিক নেতার গুলিবিদ্ধ মৃত্যুর ঘটনা হিসেবে সামনে এলেও তদন্তের অগ্রগতিতে এর সঙ্গে বড় অঙ্কের সোনা ডাকাতির একটি ঘটনার সম্ভাব্য যোগসূত্র আলোচনায় এসেছে। ফলে মামলাটি এখন শুধু হত্যাকারী শনাক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; সোনা ডাকাতির পুরো নেটওয়ার্ক, উদ্ধার হওয়া সোনার উৎস এবং দুই ঘটনার মধ্যে সম্পর্কও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তবে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সূত্রের দাবি, পুলিশের বক্তব্য এবং আদালতে প্রমাণিত তথ্য এই তিনটির মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি। গ্রেপ্তার হওয়া মানেই কেউ অপরাধী প্রমাণিত হওয়া না। নিরপেক্ষ তদন্ত, নির্ভরযোগ্য আলামত, সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই শাকের হত্যার প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং নিরপরাধ কাউকে হয়রানি না করার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।