আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং নির্বাচনী আচরণবিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচনে সহিংসতা ও অনিয়ম ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের শরীরেও ক্যামেরা থাকবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, শুধু একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন নয়, ভবিষ্যতের সব নির্বাচনে একই মান বজায় রাখার সংস্কৃতি গড়ে তোলাই কমিশনের লক্ষ্য।
নভেম্বরে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে সিইসি বলেন, আগামী নভেম্বরের মধ্যেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসার পরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনও অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজন করতে চায় কমিশন। তিনি বলেন, একটি ভালো নির্বাচন আয়োজন করেই কমিশনের দায়িত্ব শেষ হবে না। ভবিষ্যতেও যাতে একই মান বজায় থাকে, সে জন্য নির্বাচনব্যবস্থায় টেকসই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
প্রতি ধাপে ৮০০ থেকে ১ হাজার ইউপিতে নির্বাচন
সিইসি জানান, আইনগতভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ এবং আদালতের নির্দেশনার আওতায় থাকা ইউনিয়ন পরিষদগুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রতি ধাপে প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার ইউপিতে নির্বাচন আয়োজন করা হতে পারে। নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পাশাপাশি ভোটার তালিকা হালনাগাদের কার্যক্রমও চলছে। ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি। ইউপি নির্বাচনে অতীতের সহিংসতার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সিইসি বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হবে। কালো টাকা ব্যবহার, ভোট কেনা কিংবা অন্য কোনো অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
১০ মাস থেকে এক বছরে সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন
দেশের সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন সম্পন্ন করতে প্রায় ১০ মাস থেকে এক বছর সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন সিইসি। তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এ কার্যক্রম শুরু হবে। এরপর পৌরসভা নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এসএসসি পরীক্ষাসহ অন্যান্য পরীক্ষা এবং বর্ষা মৌসুমে সম্ভাব্য বন্যার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে। সিইসি আরও জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে প্রার্থী দেওয়া হবে না। তবে প্রার্থীদের পেছনে রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন থাকতে পারে। এ কারণে নির্বাচন সুষ্ঠু করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন।
## নির্বাচন কমিশনের ওপর কোনো চাপ নেই
সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, কমিশন কোনো পক্ষের চাপ ছাড়াই কাজ করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট আয়োজন এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর পোস্টাল ভোটিংয়ের মাধ্যমে প্রবাসী ও দেশের অভ্যন্তরে নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও কারাবন্দীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টির কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
ভোটার তালিকায় যুক্ত ১০ লাখ নারী, বাদ ২১ লাখ মৃত ভোটার
নির্বাচন কমিশনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনাকে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন সিইসি। তিনি জানান, ভোটার তালিকা হালনাগাদ করতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রায় ৭৭ হাজার কর্মী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ কার্যক্রমে প্রায় ১০ লাখ নারী ভোটারকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং ২১ লাখের বেশি মৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। সিইসির মতে, নির্ভুল ভোটার তালিকা এবং নির্বাচনী কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
নারী প্রার্থী বাড়াতে সামাজিক সচেতনতার তাগিদ
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ানোকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন সিইসি। তাঁর মতে, পারিবারিক নিরুৎসাহ, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানির কারণে অনেক নারী নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহ হারান। এ পরিস্থিতির পরিবর্তনে রাজনৈতিক দলসহ সমাজের বিভিন্ন পক্ষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে তরুণদের ভোটাধিকার প্রয়োগে উৎসাহিত করতে ভোটার হওয়ার সুযোগ সম্প্রসারণের কথাও তুলে ধরেন।
সাংবাদিকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে ভোটকেন্দ্র
নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে সাংবাদিকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করে সিইসি বলেন, সাংবাদিকেরা ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করে তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। তবে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার স্বার্থে নীতিমালা অনুসরণ করে পরিচয়পত্র দেওয়া হবে। জাতীয় পর্যায়ের সাংবাদিকদের পরিচয়পত্র নির্বাচন কমিশন থেকে দেওয়া হবে। স্থানীয় পর্যায়ের সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে প্রেস ক্লাবের সঙ্গে আলোচনা করে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা পরিচয়পত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। নির্বাচনী অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট ও নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান সিইসি।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক ও ভোটারদের সম্মিলিত সহযোগিতায় একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হবে।