বহর সম্প্রসারণ, রুট পরিকল্পনা ও অর্থায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শক নিয়োগে দরপত্র জমা দেওয়ার জন্য মাত্র আট দিন সময় দিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এত অল্প সময়ে আন্তর্জাতিক মানের বিস্তারিত প্রস্তাব তৈরি করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিমানের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্বাচিত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নতুন ৩৫টি উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করা, বিদ্যমান উড়োজাহাজের অবসরের সময় নির্ধারণ, লাভজনক রুট চিহ্নিত করা এবং উড়োজাহাজ কেনার অর্থায়ন কৌশল প্রণয়নে কাজ করবে। গত ২৫ অক্টোবর প্রস্তাব আহ্বান করে বিমান। প্রস্তাব জমা দেওয়ার শেষ সময় আগামী ২ নভেম্বর। আর ৮ নভেম্বরের মধ্যে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে কাজ শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সম্প্রতি মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি এবং ইউরোপীয় নির্মাতা এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে বিমান। এসব উড়োজাহাজ সংগ্রহের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও পরিচালন কৌশল নির্ধারণে পরামর্শক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিমান জানিয়েছে, সরকারের উচ্চপর্যায়ের সময়সূচির সঙ্গে সমন্বয় করতেই দরপত্র জমার সময়সীমা সংক্ষিপ্ত রাখা হয়েছে। তবে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজের জন্য মাত্র আট দিন সময় নির্ধারণের সুনির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করেনি সংস্থাটি। এ বিষয়ে দেওয়া লিখিত জবাবে বিমান জানায়, কাজের ধরন, প্রযোজ্য বিধিবিধান ও পদ্ধতি বিবেচনা করেই সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির ২০২৫ সালের ১৭ জুলাইয়ের একটি মতামতের উল্লেখ করে বিমান জানায়, নিজস্ব তহবিল থেকে কেনাকাটার ক্ষেত্রে সংস্থাটি প্রযোজ্য প্রশাসনিক ও আর্থিক বিধিবিধান অনুসরণ করে। পুরো প্রক্রিয়া নির্ধারিত নিয়ম ও প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি মেনেই সম্পন্ন করা হচ্ছে বলে দাবি করেছে বিমান। তবে কাজের ব্যাপ্তি ও বিশেষায়িত দক্ষতার প্রয়োজন বিবেচনায় এত কম সময়ে মানসম্মত প্রস্তাব পাওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। কেন্দ্রীয় ক্রয় কারিগরি ইউনিটের সাবেক মহাপরিচালক ও সাবেক সচিব মো. ফারুক হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রয় প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও দরপত্র জমা দেওয়ার জন্য আট দিন সময় দেওয়া সম্পূর্ণ অবাস্তব।
অভিজ্ঞতা ও বিশেষায়িত দক্ষতার শর্ত
প্রস্তাব আহ্বানের শর্ত অনুযায়ী, দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে গত পাঁচ বছরের মধ্যে কোনো জাতীয় বা আঞ্চলিক পতাকাবাহী এয়ারলাইনসের জন্য একই ধরনের কাজ করার অভিজ্ঞতা দেখাতে হবে। বিশেষ করে রপ্তানি ঋণ অর্থায়ন এবং উড়োজাহাজ বিক্রি করে পুনরায় লিজ নেওয়ার (সেল-অ্যান্ড-লিজব্যাক) ব্যবস্থায় কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রকল্পের মূল দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিস্তারিত জীবনবৃত্তান্ত জমা দিতে হবে। পাশাপাশি জ্যেষ্ঠ অংশীদারদের সরাসরি কাজে যুক্ত থাকার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।
পরামর্শকের দায়িত্বের মধ্যে থাকবে উড়োজাহাজ সরবরাহের সময়সূচি ও চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা পর্যালোচনা করা। নতুন ৩৫টি উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিমানের কত অর্থ প্রয়োজন হবে, তা নিরূপণ করাও হবে তাদের অন্যতম কাজ। বর্তমানে বিমানের বহরে থাকা ১৯টি উড়োজাহাজের মধ্যে কোনগুলো কখন অবসরে পাঠানো উচিত, তা পর্যালোচনা করবেন পরামর্শকরা। একই সঙ্গে বহর পরিচালনায় সক্ষমতার ঘাটতি চিহ্নিত করা, যাত্রী চাহিদা বিশ্লেষণ, রুটভিত্তিক আয় ও পরিচালন ব্যয় মূল্যায়ন করতে হবে। অর্থায়নের ক্ষেত্রে রপ্তানি ঋণ, বাণিজ্যিক ঋণ, উড়োজাহাজ সরবরাহের আগে অর্থ পরিশোধ এবং সম্ভাব্য সেল-অ্যান্ড-লিজব্যাক চুক্তির বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করতে হবে। এ ছাড়া রুট পরিকল্পনা, নেটওয়ার্ক সিমুলেশন এবং বহর পরিচালনার ব্যয় নিরূপণে ব্যবহারের পরিকল্পনা থাকা সফটওয়্যার মডেল সম্পর্কেও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে হবে। আর্থিক প্রস্তাবে পরামর্শকের পারিশ্রমিক, ভ্রমণ, তথ্য ব্যবহারের লাইসেন্স ও প্রশাসনিক ব্যয়সহ সব খরচের হিসাব মার্কিন ডলারে দিতে হবে। কাজের তিনটি ক্ষেত্র অনুযায়ী ব্যয়ের বিস্তারিত বিবরণে কর্মীদের নাম, কর্মদিবস, দৈনিক পারিশ্রমিক এবং মোট ব্যয় উল্লেখ করতে হবে।
মূল্যায়নে কারিগরি প্রস্তাবে গুরুত্ব
বিমানের নির্ধারিত মূল্যায়ন পদ্ধতিতে কারিগরি প্রস্তাবের জন্য ৭০ শতাংশ এবং আর্থিক প্রস্তাবের জন্য ৩০ শতাংশ নম্বর বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কারিগরি মূল্যায়নে ১০০ নম্বরের মধ্যে অন্তত ৭৫ নম্বর পেলে একটি প্রতিষ্ঠান যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। কারিগরি মূল্যায়নের মোট নম্বরের ৬০ শতাংশ নির্ধারিত থাকবে প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা ও বিশেষায়িত সক্ষমতার ভিত্তিতে। বাকি ৪০ শতাংশ নির্ভর করবে কাজ সম্পন্ন করার গতি এবং প্রয়োজনীয় জনবল ও সম্পদ নিয়োজিত করার প্রতিশ্রুতির ওপর। প্রস্তাব আহ্বানের নথি অনুযায়ী, আগামী ৮ নভেম্বরের মধ্যে কাজ শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। ১০ ডিসেম্বর খসড়া নির্বাহী প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পাশাপাশি সরাসরি উপস্থিত হয়ে তা উপস্থাপন করতে হবে। চূড়ান্ত পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার শেষ সময় ২০২৭ সালের ১৫ জানুয়ারি।
যোগ্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান অংশ নেবে কি না, প্রশ্ন
বিমান চলাচল খাতের বিশ্লেষক ও বিমানের সাবেক পরিচালনা পর্ষদ সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম মনে করেন, মাত্র আট দিনের সময়সীমা যোগ্য আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আকৃষ্ট করার জন্য যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিমান চলাচল ও পর্যটনবিষয়ক পাক্ষিক পত্রিকা দ্য বাংলাদেশ মনিটরের সম্পাদক ওয়াহিদুল বলেন, গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব তৈরি করতে বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞ, উড়োজাহাজ বহর পরিকল্পনাবিদ, আর্থিক বিশ্লেষক এবং রুটের অর্থনীতি বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে একটি দক্ষ দল গঠন করতে হয়। পাশাপাশি কাজের পদ্ধতি নির্ধারণ এবং বিস্তারিত বাণিজ্যিক প্রস্তাবও তৈরি করতে হয়। তার মতে, বিশেষ করে যেসব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিমানের কার্যক্রম সম্পর্কে আগে থেকে ধারণা নেই, তাদের জন্য আট দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব তৈরি করা কঠিন হতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যথাযথ কৌশল প্রণয়ন করা না হলে কিছু উড়োজাহাজ অলস পড়ে থাকতে পারে, লোকসানি রুট চালু থাকতে পারে এবং পরিচালন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। এতে বিমানের ওপর এমন আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে, যা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠবে। ওয়াহিদুলের মতে, প্রস্তাব জমা দেওয়ার জন্য আট দিন সময় দেওয়া সম্ভব হলেও এত বড় কর্মসূচির জন্য সেরা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আকৃষ্ট করতে এই সময় যথেষ্ট কি না, সে বিষয়ে বিমানকে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে হবে।