একসময় বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল পাট। বিশ্ববাজারে সোনালি আঁশের চাহিদা ও সুনাম থাকলেও নানা সংকটে পিছিয়ে পড়েছে দেশের পাটশিল্প। পাটবীজ আমদানিনির্ভরতা, বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা, মূল্য সংযোজিত পণ্যের সীমিত উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার চাপে সম্ভাবনাময় এ খাতের রপ্তানি আয়ও কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে পাটশিল্পকে নতুন করে ঘুরে দাঁড় করাতে ২ হাজার ৩২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২টি প্রকল্প হাতে নেওয়ার প্রস্তাব করেছে সরকার। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। এর পুরো অর্থায়ন করবে সরকার। প্রকল্পগুলোর অনুমোদন চেয়ে সম্প্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মো. জাহিদ হোসেন।
২০৩১ সালের মধ্যে রপ্তানি আয় ১৬৪ কোটি ডলারের লক্ষ্য মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে বার্ষিক আয় ১৬৪ কোটি ডলারে উন্নীত করতে চায় সরকার। এ লক্ষ্য অর্জনে কাঁচা পাটের উৎপাদন প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ বেল থেকে বাড়িয়ে ১ কোটি ২০ লাখ বেল করার পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে দেশের মোট পাটবীজের চাহিদার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদন এবং মূল্য সংযোজিত পণ্যের অংশ ৪৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
যুগ্ম সচিব জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ সোনালি আঁশের দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও এখনো চাহিদার ৮০ শতাংশের বেশি পাটবীজ আমদানি করতে হয়। কূটনৈতিক বা বাণিজ্যিক সম্পর্কে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বীজ সরবরাহে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ নির্ভরতা কমাতেই সরকারের এ উদ্যোগ।
কমেছে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আয় রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছিল ১১৬ কোটি ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা প্রায় ২৪ শতাংশ কমে ৮৮ কোটি ৩৬ লাখ ৯০ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, মূল্য সংযোজিত পণ্যের সীমিত উৎপাদন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ সংকুচিত হওয়া, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং ভারতের আরোপ করা অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের কারণে রপ্তানি আয় কমেছে।
এ ছাড়া দেশের ২৬৬টি পাটকলের মধ্যে ৭৩টি বন্ধ হয়ে যাওয়া, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিসম্পন্ন পরীক্ষাগারের অভাব এবং পাট অধিদপ্তরে বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য থাকাও এ শিল্পের বড় চ্যালেঞ্জ। ১২ প্রকল্পে যেসব খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব পাটবীজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার, গবেষণা এবং বহুমুখী পাটপণ্যের উৎপাদন বাড়াতে প্রকল্পগুলো সাজানো হয়েছে। প্রস্তাবিত বরাদ্দের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো
- ৩০০ কোটি টাকা: বীজ উৎপাদনকারী এলাকায় পাটবীজের উৎপাদন ও বিতরণ বাড়ানো।
- ৩০০ কোটি টাকা: আধুনিক পাট কাটার ও আঁশ ছাড়ানোর যন্ত্রপাতি কেনা।
- ১২০ কোটি টাকা: উৎপাদনশীলতা, আঁশের মান ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে যৌথ গবেষণা।
- ১৫০ কোটি টাকা: পাটের উৎপাদন, বিক্রি, রপ্তানি ও ব্যবহার নিয়ে ডিজিটাল ডেটাবেইস তৈরি।
- ৫০ কোটি টাকা: পরিবেশবান্ধব পাট পচানোর প্রযুক্তি উদ্ভাবন।
- ১০০ কোটি টাকা: লবণাক্ততাপ্রবণ ও পাহাড়ি অনাবাদি জমিতে পাটবীজের চাষ সম্প্রসারণ।
- ২৫০ কোটি টাকা: রাজশাহী ও রংপুরে বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনকারী রপ্তানিমুখী উদ্যোক্তাদের সহায়তা।
- ১২০ কোটি টাকা: পাটখড়ি থেকে চারকোল ও অ্যাকটিভেটেড কার্বন উৎপাদন।
- ২৮০ কোটি টাকা: আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিসম্পন্ন পরীক্ষাগার ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
- ১০০ কোটি টাকা: কাঁচা পাটের মূল্য ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল ক্রয়ব্যবস্থা উন্নয়ন।
প্রস্তাবিত ১২টি প্রকল্পের মধ্যে এসব খাতের বাইরে আরও দুটি প্রকল্প রয়েছে। তবে সরবরাহ করা তথ্যে সেগুলোর বরাদ্দ ও বিস্তারিত বিবরণ উল্লেখ করা হয়নি। শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, বাজারও তৈরি করতে হবে পাট খাত পুনরুজ্জীবনে সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তবে তাঁর মতে, প্রস্তাবিত কয়েকটি প্রকল্পে এ শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো যথাযথভাবে গুরুত্ব পায়নি। তিনি বলেন, শুধু উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; দেশি ও বিদেশি বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করাও বড় চ্যালেঞ্জ। পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন কার্যকর না হওয়ায় দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও পাটপণ্যের চাহিদা বাড়ছে না। আইন অনুযায়ী, ২১টি পণ্য পাটের বস্তায় মোড়কজাত করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এখনো ব্যাপকভাবে প্লাস্টিকের মোড়ক ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে পাটের অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বাজারের প্রসঙ্গ তুলে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ভারত বাংলাদেশের পাটজাত পণ্যের প্রধান বাজার হলেও দেশটির আরোপ করা অ্যান্টি-ডাম্পিং ও কাউন্টারভেইলিং শুল্ক রপ্তানিতে বাধা সৃষ্টি করছে। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সরকারের আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। তাঁর মতে, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ, রপ্তানির বাধা দূর করা এবং বিদ্যমান মোড়কজাতকরণ আইন কার্যকর করাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
কাঁচা পাট নয়, বাড়াতে হবে প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানি অর্থনীতিবিদ গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, বাংলাদেশ এখনো মূলত কাঁচা পাট রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে ভারত পাট প্রক্রিয়াজাত করে উচ্চমূল্যের বহুমুখী পণ্য তৈরি করছে এবং বেশি মুনাফা অর্জন করছে। বাংলাদেশেরও এ ধরনের পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
তিনি পাটবীজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, উপযোগী উপকূলীয় ও লবণাক্ত এলাকায় চাষ সম্প্রসারণ এবং বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগকে সমর্থন করেছেন। তবে প্রকল্পগুলোর বড় অঙ্কের বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, খাতটির প্রকৃত চাহিদা ও সরকারের বিদ্যমান সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যয় নির্ধারণ করা উচিত। তাঁর ভাষায়, প্রস্তাবিত অনেক প্রকল্পই আমলাতান্ত্রিক ও সরবরাহনির্ভর মনে হচ্ছে। অথচ পাটশিল্পের বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাজার সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়ানো।
সব মিলিয়ে, পাটবীজের আমদানিনির্ভরতা কমানো থেকে শুরু করে আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা ও বহুমুখী পণ্য উৎপাদনে সরকারের প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি বাজার সৃষ্টি, রপ্তানি বাধা দূর করা এবং পাটজাত পণ্যের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন কার্যকর না হলে ২০৩১ সালের মধ্যে রপ্তানি আয় দ্বিগুণ করার লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে।