শিল্পকারখানা বন্ধ, কর্মসংস্থানের সংকট, অনানুষ্ঠানিক পেশার বিস্তার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নতুন জনবসতি সব মিলিয়ে জটিল চ্যালেঞ্জের মুখে খুলনা নগরী। অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন, পরিকল্পিত নগরায়ণ ও পরিবেশ সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের। একসময় দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পনগরী হিসেবে পরিচিত ছিল খুলনা। পাট, কাগজ, নিউজপ্রিন্ট, টেক্সটাইল ও দেশলাই শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল এ শহরের অর্থনীতি। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পেয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ খুলনায় আসতেন। শিল্পের প্রসারের সঙ্গে বাড়তে থাকে আবাসন, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক অবকাঠামো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। একের পর এক শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ায় সংকুচিত হয়েছে কর্মসংস্থান। বিকল্প জীবিকার সন্ধানে অনেক মানুষ যুক্ত হয়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসা, পরিবহন, ফুটপাতের দোকান কিংবা দৈনিক মজুরির কাজে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চল থেকে আসা মানুষের চাপও বাড়ছে শহরটির ওপর।
ফলে একদিকে শহরের জনবসতি ও আয়তন বাড়ছে, অন্যদিকে দুর্বল হচ্ছে এর ঐতিহ্যবাহী অর্থনৈতিক ভিত্তি। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, খুলনার এই বাস্তবতা শুধু অপরিকল্পিত নগরায়ণের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শিল্পের পতন, কর্মসংস্থানের সংকট, আবাসন বৈষম্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি।
শিল্পনগরী থেকে অর্থনৈতিক সংকটে খুলনার শিল্প বিকাশের পেছনে ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নদীপথে যোগাযোগ, মোংলা বন্দরের নৈকট্য এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদের সহজলভ্যতা এ অঞ্চলে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করে। বিশেষ করে ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে খালিশপুর, দৌলতপুরসহ আশপাশের এলাকায় বড় বড় শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে। একসময় এসব মিলে প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় এক লাখ মানুষ এসব শিল্পের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।
শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে শ্রমিক আবাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, বাজার ও যোগাযোগব্যবস্থা। খালিশপুর হাউজিং এস্টেট ছিল কর্মসংস্থান ও পরিকল্পিত নগর উন্নয়নের সমন্বিত উদাহরণ। তবে বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হতে থাকে। উৎপাদন কমে যাওয়া, আধুনিকায়নের অভাব, প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া এবং শিল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ২০২০ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ হওয়ার পর খুলনার শিল্পনির্ভর অর্থনীতির সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
অনানুষ্ঠানিক পেশায় বাড়ছে মানুষের নির্ভরতা
শিল্পকারখানা বন্ধ হলেও মানুষের জীবিকার প্রয়োজন থেমে থাকেনি। ফলে অনেক সাবেক শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা বিকল্প পেশায় যুক্ত হয়েছেন। কেউ ফুটপাতে পণ্য বিক্রি করছেন, কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসা কিংবা পরিবহন খাতে কাজ করছেন। অনেকে ঘরে বসে ছোট উদ্যোগ পরিচালনা করছেন।
বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় দেখা গেছে, খুলনায় অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বিস্তারের পেছনে প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির অভাব, অভিবাসন, পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগ এবং আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
অথচ নগর পরিকল্পনায় এসব মানুষের জীবিকা নির্বাহের বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব পায় না। সাধারণত আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকার জন্য জমি বরাদ্দ, রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো নির্মাণেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শহরকে বাসযোগ্য করতে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। মানুষের কাজের সুযোগ, আয় ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও নগর পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।
জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে জনসংখ্যার চাপ
২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডর ও ২০০৯ সালের আইলার পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় মানুষের জীবন-জীবিকায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও কৃষিজমির ক্ষতির কারণে অনেক পরিবার বিকল্প জীবিকার সন্ধানে খুলনাসহ বিভিন্ন শহরে চলে আসে।
কিন্তু নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত থাকায় এসব মানুষের বড় একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক পেশায় যুক্ত হন। অনেককে বস্তি, স্বল্প ভাড়ার বাসা কিংবা পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করতে হচ্ছে।
এদিকে শহরের চারপাশে কৃষিজমি ও নিচু জমি ভরাট করে নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে উঠছে। এতে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে। জলাশয় ও প্রাকৃতিক জলাধার ভরাটের কারণে জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকিও বাড়ছে।
এভাবে খুলনায় এক ধরনের বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। শহরটি আয়তনে সম্প্রসারিত হলেও এর পুরোনো অর্থনৈতিক ভিত্তি ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
কেমন পরিকল্পনা প্রয়োজন খুলনার জন্য?
খুলনার ভবিষ্যৎ উন্নয়নে গতানুগতিক মাস্টারপ্ল্যানের পরিবর্তে অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন, কর্মসংস্থান, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও জলবায়ু সহনশীলতাকে সমন্বিত করে পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।
এ ক্ষেত্রে মোংলা বন্দর, আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং কৃষি ও উপকূলীয় অর্থনীতির সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। লজিস্টিকস, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা শিল্প ও জ্ঞানভিত্তিক খাতে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা গেলে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে অব্যবহৃত শিল্পকারখানার জমি নতুন শিল্প, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগে পরিবেশগত ঝুঁকি, জমির মালিকানা ও স্থানীয় মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় রাখতে হবে।
তরুণদের কর্মসংস্থানেও বিশেষ গুরুত্ব প্রয়োজন। কারিগরি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা তৈরি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করা সম্ভব।
কৃষিজমি ও জলাধার রক্ষায় গুরুত্ব
খুলনার অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ ঠেকাতে কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণকে নগর পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
শহরের চারপাশের কৃষিজমি কেবল খালি জায়গা নয়; এটি খাদ্য উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাই নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কৃষিজমি ও পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চল রক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে শহরের ঘনত্ব বাড়ানো, পর্যাপ্ত ড্রেনেজ, খোলা জায়গা, সাশ্রয়ী আবাসন ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
পরিকল্পনার পাশাপাশি চাই বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি
খুলনায় বিভিন্ন সময়ে মাস্টারপ্ল্যান, স্ট্রাকচার প্ল্যান ও ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু এসব পরিকল্পনার কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, কোন সুপারিশ কার্যকর হয়েছে এবং কোথায় ব্যর্থতা রয়েছে—তার নিয়মিত মূল্যায়ন জরুরি।
এ ক্ষেত্রে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ), খুলনা সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
প্রতিটি উন্নয়ন পরিকল্পনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, বাস্তবায়নের সময়সীমা, অর্থায়ন ও পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি জনসমক্ষে প্রকাশ করলে জবাবদিহি বাড়বে।
নগর উন্নয়নে শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, স্থানীয় বাসিন্দা, শিল্পশ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নারী, জলবায়ু অভিবাসী, বিশ্ববিদ্যালয় ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করতে হবে।
ভবিষ্যতের খুলনা কেমন হবে?
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, খুলনার উন্নয়নে লন্ডনের ডকল্যান্ডস এলাকার পুনর্গঠনের অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। সরকারি নেতৃত্ব, অবকাঠামোতে বিনিয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও বেসরকারি খাতের অংশীদারত্বের মাধ্যমে সেখানে একসময় অবক্ষয়িত শিল্পাঞ্চলকে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়েছে।
তবে খুলনার ক্ষেত্রে কোনো বিদেশি মডেল হুবহু অনুসরণ না করে স্থানীয় অর্থনীতি, জনসংখ্যা ও পরিবেশগত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
খুলনার ভবিষ্যৎ শুধু পুরোনো শিল্পের স্মৃতি ধরে রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং নতুন শিল্পায়ন, উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান, তরুণদের দক্ষতা, সাশ্রয়ী আবাসন, কৃষিজমি সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার সমন্বিত উদ্যোগই পারে শহরটিকে নতুন অর্থনৈতিক ভিত্তি দিতে।
বিশ্ব নগর দিবসের প্রেক্ষাপটে খুলনার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের অন্যান্য শহরের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। একটি শহরকে বাসযোগ্য করতে শুধু রাস্তাঘাট, ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শক্তিশালী অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নগর ব্যবস্থাপনা।
লেখক: ড. মো. আশিক উর রহমান, অধ্যাপক, নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা বিভাগ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।