জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ক্ষতি ক্রমেই বাড়ছে। শুধু অতিরিক্ত গরমের কারণে ২০২৫ সালে দেশে সম্ভাব্য আয় ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৭৫০ কোটি ডলার। একই সঙ্গে তাপপ্রবাহ, বায়ুদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে বাড়ছে মানুষের মৃত্যুঝুঁকি। ‘ল্যানসেট কাউন্টডাউন ২০২৬: স্বাস্থ্য ও জলবায়ু পরিবর্তন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। রোববার (১ নভেম্বর) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ওপর গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ (সি৩ইআর) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে কারিগরি সহায়তা দেয় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড হেলথ প্রমোশন ইউনিট।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৮৬ থেকে ২০০৫ সালের তুলনায় বাংলাদেশে শিশু ও বয়স্কদের তাপপ্রবাহের কবলে পড়ার হার দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে এক বছরের কম বয়সী শিশুরা ৭ দশমিক ৬ দিন এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সীরা ৭ দশমিক ২ দিন তাপপ্রবাহের মধ্যে কাটিয়েছে। আগের সময়ের তুলনায় এই হার যথাক্রমে ১৬২ ও ১৩৬ শতাংশ বেশি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অতিরিক্ত গরমের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ২ হাজার ৬০০ কোটির বেশি সম্ভাব্য শ্রমঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকের বার্ষিক গড়ের তুলনায় এ ক্ষতি ৭১ শতাংশ বেশি।
গরমের কারণে বয়স্কদের মৃত্যুঝুঁকিও বাড়ছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের অতিরিক্ত গরমজনিত মৃত্যুর কারণে বছরে গড়ে ৩৮০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি প্রায় ২ লাখ ১৬ হাজার মানুষের এক বছরের আয়ের সমান। বায়ুদূষণ পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট সূক্ষ্ম বস্তুকণা (পিএম২.৫) দূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত মৃত্যুর সংখ্যা ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৩ সালে এ ধরনের বায়ুদূষণে আনুমানিক ২ লাখ ৩৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এসব মৃত্যুর ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল জীবাশ্ম জ্বালানি। এ ছাড়া ২০২৩ সালে গৃহস্থালির বায়ুদূষণে ৭৭ হাজার ৫০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ২০১৬ সালে এ সংখ্যা ছিল ৯০ হাজার ৭০০।
জ্বালানি খাতেও কার্বন নিঃসরণ বেড়েছে। ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ৯ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৪ সালে জীবাশ্ম জ্বালানিতে সরকারের নিট ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৩০ কোটি ডলার, যা দেশের স্বাস্থ্য বাজেটের ৫২ দশমিক ৯ শতাংশের সমান। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পরিবেশবিষয়ক অর্থনীতিবিদ শৌর্য দাশগুপ্ত। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবিকার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হক বলেন, ল্যানসেট কাউন্টডাউনের প্রতিবেদন জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য এসব তথ্য তাৎপর্যপূর্ণ। সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক আতিক রহমান বলেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে কর্মজীবী মানুষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পাশাপাশি মা ও শিশুরাও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। ল্যানসেট কাউন্টডাউনের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মারিনা রোমানেলো বলেন, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রস্তুতিতে অগ্রগতি থাকলেও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যক্ষতির গতি মোকাবিলায় বিশ্বের অগ্রগতি যথেষ্ট নয়।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। তাঁর মতে, স্বাস্থ্যবিষয়ক জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি এবং মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড হেলথ প্রমোশন ইউনিটের সমন্বয়ক ইকবাল কবির।