একসময় খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল চিংড়ি চাষ। বাগদা ও গলদা চিংড়ি রপ্তানি করে এ অঞ্চলে তৈরি হয়েছিল বিপুল কর্মসংস্থান। চিংড়ি পরিচিতি পেয়েছিল ‘সাদা সোনা’ হিসেবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সম্ভাবনাময় শিল্পে দেখা দিয়েছে নানা সংকট। মানসম্মত পোনার অভাব, রোগবালাই, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতায় চিংড়ি চাষ এখন ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। ঘেরে চিংড়ি চাষ করেও উৎপাদনের নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না কৃষক। অন্যদিকে উৎপাদিত চিংড়ির ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। এর প্রভাব পড়ছে চাষি, ব্যবসায়ী, প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার শ্রমিক এবং রপ্তানিকারকদের ওপর। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই রপ্তানি খাত আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
বিপুল চাষের জমি, সংকটে মানসম্মত পোনা
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, খুলনায় ৩৩ হাজার ৪৩৭ হেক্টর, বাগেরহাটে ৩৮ হাজার ৯৮২ হেক্টর এবং সাতক্ষীরায় প্রায় ৭৪ হাজার ২৪৯ হেক্টর জমিতে চিংড়ি ও গলদা চাষ হয়। তিন জেলায় চিংড়ি চাষের আওতাধীন জমির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার হেক্টর।
এত বিপুল পরিমাণ জমি চাষের আওতায় থাকলেও মানসম্মত ও রোগমুক্ত পোনার সংকট শুরুতেই চাষিদের ঝুঁকিতে ফেলছে। বাগেরহাটের আটটি লাইসেন্সধারী গলদা হ্যাচারির মধ্যে চারটি বন্ধ রয়েছে। ফলে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে পোনা সংগ্রহ করতে সমস্যায় পড়ছেন চাষিরা। অনেককে অনিয়ন্ত্রিত বিক্রেতার কাছ থেকে বেশি দামে পোনা কিনতে হচ্ছে। কেউ কেউ প্রাকৃতিক উৎসের ওপরও নির্ভর করছেন। এতে বিনিয়োগ বাড়লেও উৎপাদনের নিশ্চয়তা মিলছে না।
রোগবালাই ও উৎপাদন ব্যয়ে বাড়ছে লোকসান
অপরিকল্পিত চাষ, পানির গুণগত মানের অবনতি, অতিরিক্ত ঘনত্বে পোনা মজুদ এবং দুর্বল জৈব নিরাপত্তার কারণে চিংড়ি চাষে রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বাড়ছে। রোগ দেখা দিলে দ্রুত শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা না পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছেন চাষিরা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খাদ্য, শ্রম, জ্বালানি ও ঘের রক্ষণাবেক্ষণের বাড়তি ব্যয়। উৎপাদন খরচ বাড়লেও বিক্রির সময় সেই অনুপাতে দাম পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বাজারে চিংড়ির ভালো চাহিদা থাকলেও সব চাষির জন্য লাভ নিশ্চিত হচ্ছে না। জলবায়ু পরিবর্তনও এ শিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা এবং লবণাক্ততার পরিবর্তনে ঘেরের স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাঁধ ভেঙে নোনাপানি কিংবা বন্যার পানি ঢুকে পড়লে এক রাতেই শেষ হয়ে যেতে পারে চাষির সারা বছরের বিনিয়োগ।
রপ্তানি আয় বাড়লেও কাটছে না সংকট
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে খুলনা অঞ্চলে চিংড়ির উৎপাদন ছিল ১ লাখ ২৩ হাজার ১৫১ মেট্রিক টন। এ সময় অঞ্চলটি থেকে ১৯ হাজার ৫১২ টন চিংড়ি রপ্তানি করে আয় হয় প্রায় ২ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা। রপ্তানি আয় থাকলেও শিল্পের সামগ্রিক পরিস্থিতি খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। কাঁচামালের সংকট, বৈশ্বিক বাজারের চাহিদার পরিবর্তন এবং উৎপাদনসংক্রান্ত নানা সমস্যায় দেশের অনেক চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। যেসব কারখানা চালু রয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এর ফলে রপ্তানি সরবরাহ ব্যবস্থার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চিংড়ি সংগ্রহ, বাছাই, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষের নিয়মিত আয়ের পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
সমন্বিত পরিকল্পনার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের
মৎস্য ও জলজ চাষ বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চিংড়ি শিল্পকে টেকসই করতে হলে উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে কার্যকর পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু চাষের জমি বাড়ানো কিংবা বেশি পোনা ছাড়লেই উৎপাদন বাড়বে না। মানসম্মত পোনা সরবরাহ, রোগ প্রতিরোধ, পানির গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক ঘের ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। খুলনা অঞ্চলের মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে একসময় যুক্ত ছিলেন লিপটন সরদার। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি চিংড়িকেন্দ্রিক প্রকল্প-উদ্যোগের আওতায় চাষিদের প্রশিক্ষণ, উন্নত প্রযুক্তি সরবরাহ, স্বাস্থ্যবিধি ও জৈব নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো দাম পাওয়ার উপযোগী মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।’ তার মতে, চাষিদের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়েই প্রযুক্তির ব্যবহার ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে হবে।
ন্যায্যমূল্য ও বাজার সংযোগ নিশ্চিত করার দাবি
চিংড়ি শিল্পের সংকট শুধু উৎপাদন পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাজার ব্যবস্থাপনাও। উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম না পেলে চাষিরা দীর্ঘমেয়াদে চিংড়ি চাষে আগ্রহ হারাবেন। অন্যদিকে মানসম্মত কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না থাকলে রপ্তানিকারকদের পক্ষেও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা পূরণ করা কঠিন হবে।এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় চাষি, আড়তদার, প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে কার্যকর বাজার সংযোগ গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের স্বাস্থ্যবিধি, খাদ্যনিরাপত্তা ও পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বন্ধ হ্যাচারিগুলো পুনরায় চালুর সম্ভাবনা যাচাই, রোগমুক্ত পোনা উৎপাদনে বিনিয়োগ, চিংড়ি গবেষণা সম্প্রসারণ এবং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের পুনর্বাসনে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুন রপ্তানি বাজার অনুসন্ধান ও বাজার বহুমুখীকরণের উদ্যোগ নিতে হবে।
সম্ভাবনা ধরে রাখতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ জরুরি
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চিংড়ি শিল্পের সম্ভাবনা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। বিদ্যমান চাষের জমি, অভিজ্ঞতা ও রপ্তানি অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে এ জন্য পোনা সংকট, রোগবালাই, উৎপাদন ব্যয়, ন্যায্যমূল্য এবং বাজারের অনিশ্চয়তাকে সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করতে হবে।
চিংড়ি শিল্প শুধু রপ্তানি আয়ের উৎস নয়, উপকূলীয় অঞ্চলের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা ও অর্থনীতির সঙ্গেও জড়িত। তাই ‘সাদা সোনা’র হারানো সুদিন ফিরিয়ে আনতে হলে চাষি থেকে রপ্তানিকারক—সব পক্ষের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ ও টেকসই করে গড়ে তোলা জরুরি।