জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট, নির্বাচনী কৌশল, রাজনীতিতে নারীর অধিকার এবং দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে মতপার্থক্যের জেরে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন সামান্তা শারমিন। একই সঙ্গে পদত্যাগপত্রে দলের রাজনৈতিক অবস্থান ও সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে নিজের অসন্তোষের কারণও তুলে ধরেন তিনি।
পদত্যাগপত্রে সামান্তা শারমিন জানান, প্রায় এক বছর আগে থেকেই এনসিপির জোট গঠনের প্রশ্নে তিনি ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর মতে, জামায়াতে ইসলামী নীতিগত ও কৌশলগতভাবে সংস্কারমূলক রাজনীতির উপযুক্ত অংশীদার নয়। দলটির সঙ্গে জোট গঠনের কারণে এনসিপিকে বড় ধরনের রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেছিলেন।
তিনি আরও জানান, গত ১১ মাসে দলের অতীত কর্মকাণ্ড ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে লিখিত অভিযোগ ও প্রস্তাব দিয়েছেন। দলের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্বিবেচনার চেষ্টা করলেও তাতে সফল হননি।
পদত্যাগপত্রে চারটি বিষয়ে নিজের আপত্তির কথা উল্লেখ করেছেন সামান্তা শারমিন।
জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে আপত্তি
সামান্তা শারমিনের অভিযোগ, এনসিপি সংস্কারকেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে সরে এসে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটের পথে এগোচ্ছে। তাঁর মতে, জামায়াত সাংবিধানিক, আইনি ও রাজনৈতিক সংস্কারের রাজনীতি ধারণ করে না। এ জোটের কারণে এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় ও অবস্থানও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
নির্বাচনী কৌশল নিয়ে অসন্তোষ
২০২৬ সালের নির্বাচনকে শুধু ক্ষমতা পরিবর্তনের নির্বাচন নয়, বরং রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে দেখার পক্ষে ছিলেন তিনি। তাঁর মতে, পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জোট না করে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া কিংবা বিকল্প কৌশল গ্রহণ করলে এনসিপি নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান আরও স্পষ্ট করতে পারত।
এ প্রসঙ্গে শহীদ ওসমান হাদির মৃত্যুর ঘটনাকে বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট গঠনের যুক্তি হিসেবে ব্যবহারেরও সমালোচনা করেছেন তিনি। সামান্তা শারমিনের দাবি, হাদি ঢাকার একটি ঝুঁকিপূর্ণ আসনে এককভাবে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর ঘটনাকে জোটের পক্ষে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা অযৌক্তিক।
রাজনীতিতে নারীর অধিকার ও অংশগ্রহণ
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে সামান্তা শারমিন বলেন, আন্দোলনে নারীরা সম্মুখসারিতে থেকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেও পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অধিকার, মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁদের যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
তাঁর অভিযোগ, এনসিপি নারীর নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পরিবর্তে রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে আপস করেছে। এতে গণ-অভ্যুত্থানের বৈষম্যবিরোধী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কাউন্সিল ছাড়াই কমিটি পুনর্গঠন
দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সামান্তা শারমিন। তাঁর মতে, কাউন্সিল আয়োজন না করে আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন করায় দলের গণতান্ত্রিক চর্চা ও জবাবদিহি দুর্বল হয়েছে। নেতৃত্ব নির্বাচনের আগে এ ধরনের সাংগঠনিক পরিবর্তন দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, যে দল নিজেদের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে না, সেই দলের পক্ষে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষতার দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য?
পদত্যাগপত্রের শেষাংশে সামান্তা শারমিন জানান, এসব বিষয়ে বারবার পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানালেও এনসিপি নিজেদের রাজনৈতিক গতিপথ পরিবর্তনে আগ্রহ দেখায়নি। ফলে প্রায় এক বছরের অভ্যন্তরীণ মতাদর্শিক লড়াইয়ের ইতি টেনে দল থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।