অবশেষে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে মৌসুমের প্রথম পর্যটকবাহী জাহাজ। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) প্রথম দিন ৮৩৬ পর্যটক নিয়ে দ্বীপের উদ্দেশে যাত্রা করেছে একটি জাহাজ। সকাল ৭টা ৫০ মিনিটের দিকে কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে এমভি বারো আউলিয়া জাহাজটি সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। এর মধ্য দিয়ে পর্যটন মৌসুম শুরুর চারদিন পর আনুষ্ঠানিকভাবে সচল হলো সেন্টমার্টিনের নৌপথ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকারি অনুমোদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য দ্বীপ ভ্রমণের সুযোগ থাকলেও প্রশাসনিক অনুমোদন, নৌযান চলাচলের ছাড়পত্র এবং পরিবেশগত শর্ত পূরণ নিয়ে জটিলতায় নির্ধারিত সময়ে জাহাজ চলাচল শুরু করা যায়নি। প্রথম দিন একটি জাহাজে আট শতাধিক পর্যটক যাত্রা করেছেন। তবে অনুমোদন পাওয়া তিনটি জাহাজের সম্মিলিত যাত্রী ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৯৮ জন।
এর মধ্যে এমভি বারো আউলিয়ায় ৮৫০ জন, এমভি কর্ণফুলীতে ৭৩২ জন এবং এমভি টেকনাফে ৭১৬ জন যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে। জাহাজগুলোর নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, এমভি বারো আউলিয়ার সকাল ৭টায় কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করার কথা। ফেরার জন্য দ্বীপ থেকে জাহাজ ছাড়ার কথা দুপুর আড়াইটায়। এমভি কর্ণফুলী সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে গিয়ে ফেরার জন্য ঘাট ছাড়বে দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে। আর এমভি টেকনাফ সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে যাত্রা শুরু করে বিকেল সাড়ে ৩টায় দ্বীপ থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে।
কুমিল্লা থেকে আসা পর্যটক নাসরিন জাহান বলেন, অনেক দিন ধরে সেন্টমার্টিন যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলাম। শেষ পর্যন্ত যেতে পারছি, এটা অনেক আনন্দের। জাহাজ ছাড়ার পর মনে হচ্ছে, এতদিনের অপেক্ষা সার্থক হয়েছে। ঢাকা থেকে আসা পর্যটক তানভীর হোসাইন বলেন, সেন্টমার্টিন ভ্রমণে যাতায়াত খরচ অনেকের জন্যই বড় বিষয়। টিকিটের দাম সহনীয় রাখার পাশাপাশি যাত্রীরা যেন ভালো সেবা পান, সেটাই প্রত্যাশা।
জাহাজ মালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর জানান, জেলা প্রশাসনের সম্মতি পাওয়ার পর বৃহস্পতিবার একটি জাহাজ চলাচলের সিদ্ধান্ত হয়। আগে থেকে টিকিট সংগ্রহ করা পর্যটকরা এ জাহাজে দ্বীপে যেতে পেরেছেন। অন্য দুটি জাহাজের শুক্রবার চলাচল শুরু করার কথা রয়েছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান বলেন, অনেক পর্যটক আগেই টিকিট সংগ্রহ করেছিলেন। তাদের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করেই বৃহস্পতিবার একটি জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত ১ নভেম্বর থেকে আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্টমার্টিন পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এসময় দ্বীপে ভ্রমণের পাশাপাশি প্রতিদিন সাড়ে ৩ হাজার পর্যটকের রাতযাপনের সুযোগ রয়েছে। দ্বীপে প্রবেশের জন্য প্রত্যেক পর্যটককে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে। এ ছাড়া ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোডযুক্ত টিকিট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ হাজার পর্যটক দ্বীপে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে দ্বীপে বেশ কিছু বিধিনিষেধও বহাল রয়েছে। রাতে সৈকত ও আশপাশের এলাকায় আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি এবং বারবিকিউ পার্টি আয়োজন নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ ও কেনাবেচা এবং সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, তারামাছ, রাজকাঁকড়া, সামুদ্রিক ঘাস ও শৈবালসহ দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়-এমন কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
দীর্ঘ অনিশ্চয়তা কাটিয়ে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় সেন্টমার্টিনে পর্যটন মৌসুম ঘিরে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পর্যটকের আগমন বাড়লে দ্বীপের হোটেল-রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও পরিবহন ব্যবসায় গতি ফিরবে। একই সঙ্গে পর্যটননির্ভর দ্বীপবাসীর কর্মসংস্থান ও জীবিকার সুযোগ বাড়বে। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে দ্বীপের মানুষের মুখেও হাসি ফুটবে বলে প্রত্যাশা স্থানীয়দের।